বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
প্রশ্ন : আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন। কোনো কোনো মসজিদের ইমাম সাহেবকে দেখি লাঠির উপর ভর দিয়ে খুতবা দেন। এটা কি সুন্নত?
উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ।
লাঠি অথবা এজাতীয় কোনো বিষয়, যেমন ধনুক, তরবারি ইত্যাদির উপর ভর দিয়ে খুতবা দেয়া বিষয়ে শরিয়তবিদদের দুটি অভিমত রয়েছে:
প্রথম অভিমত: এরূপ করা মুস্তাহাব, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাবের অধিকাংশ উলামা এ মতের পক্ষে গিয়েছেন।
ইমাম মালেক র. বলেন,’খুতবা দেন এমন ইমামদের জন্য এরূপ করা মুস্তাহাব। অর্থাৎ তারা লাঠিতে ভর করা অবস্থায় খুতবা দেবেন। এরূপই আমরা দেখেছি ও শুনেছি।‘ [ আল মুদাউওয়ানাতুল কুবরা :১/১৫১] মালিকি মাযহাবের পরবর্তী যুগের কিতাবপত্রে এ অভিমতকেই নির্ভরযোগ্য বলা হয়েছে। [ দেখুন: জাওয়াহেরুল ইকলীল: ১/৯৭ ও হাশিয়াতুদ্দাসুকি: ১/৩৮২ ]
ইমাম শাফেয়ি র. বলেন,’যে খুতবা প্রদান করবেন - তা যে প্রকৃতিরই হোক না কেন- তিনি কোনো কিছুর উপর ভর দেবেন, এটাই আমার কাছে পছন্দনীয়।‘ [ আল উম্ম:১২৭২] এ বিষয়ে শাফেয়ি মাযহাবের ফতোয়া এটাই। [ দ্র: নিহায়াতুল মুহতাজ : ২/৩২৬ ও হাশিয়াতু কালয়ুবি:১/২৭২ ]
হাম্মলি মাযহাবের ইমাম বাহুতি র. বলেন,’যে কোনো হাত দিয়ে তরবারি, ধনুক বা লাঠির উপর ভর দিয়ে খুতবা দেয়া সুন্নত।‘ [ কাশশাফুলকেনা:২/৩৬, আরো দ্র: আল ইনসাফ: ২/৩৯৭ ]
এই অভিমত যারা ব্যক্ত করেছেন তাদের কথা হল, লাঠির উপর ভর দিয়ে খুতবা দেয়া রাসূলুল্লাহ থেকে বহু হাদিসে প্রমাণিত। তন্মধ্যে একটি হল হাকাম ইবনে হাযামের হাদিসে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিন (লাঠি অথবা ধনুকের উপর ভর দিয়ে খুতবা দিয়েছেন, অতঃপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেছেন...) [ আবু দাউদ: ১০৯৬, ইমাম নববি আল মাজমু গ্রন্থে হাদিসটি হাসান বলেছেন, (৪/৫২৬) সহিহু আবি দাউদ গ্রন্থে আলবানি র. হাদিসটিকে হাসান বলে আখ্যায়িত করেছেন। অবশ্য শরিয়তবিদদের কেউ কেউ হাদিসটি যয়িফ বলেছেন। ইবনে কাছির র. ইরশাদুল ফকিহ গ্রন্থে (১/১৯৬) বলেন,’এই হাদিসের সনদটি শক্তিশালী নয়।‘
দ্বিতয় অভিমত; এরূপ করা মাকরুহ, হানাফি মাযহাবের এটাই ফতোয়া, যদিও এ মাযহাবের কিছু ফকিহ এ মতের বিরুদ্ধে গিয়েছেন।
ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়াতে আল মুহিতুল বুরহানি গ্রন্থের রচয়িতার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে:
খতিব যদি লাঠি অথবা ধনুকের উপর ভর দিয়ে খুতবা দেন, তবে তা জায়েজ, কিন্তু এরূপ করা মাকরুহ; কারণ তা সুন্নতের খেলাফ। [ ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া:২/৬১]
হানাফি মাযহাবের আরেকটি ফতোয়াগ্রন্থ, ফতোয়ায়ে হিন্দিয়াতে এসেছে (১/১৪৮) :
ধনুক অথবা লাঠির উপর ভর দিয়ে খুতবা দেয়া মাকরুহ, খুলাসা ও আল মুহিত গ্রন্থদ্বয়ে এরূপই এসেছে। আর যেসব দেশ যুদ্ধের মাধ্যমে জয় হয়েছে সেসব দেশে খতিবগণ তরবারি ঝুলিয়ে খুতবা দিবে। তাহাবি গ্রন্থের ব্যাখ্যায় এরূপই রয়েছে।
ইমাম ইবনুল কাইয়েমের কথাও প্রমাণ করে যে মিন্বারে খুতবা দেয়ার সময় লাঠির উপর ভর দেয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত নয়।
তিনি বলেন:’ তিনি তরবারি বা অন্য কিছু নিয়ে খুতবা দিতেন না। মিন্বার নির্মাণের পূর্বে তিনি ধনুক অথবা লাঠির উপর ভর দিতেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি ধনুকের উপর ভর দিয়ে খুতবা দিতেন, আর মসজিদে লাঠির উপর। তরবারির উপর ভর দিয়ে খুতবা দিয়েছেন বলে কোনো বর্ণনায় নেই। কিছু মূর্খ লোক মনে করে থাকে যে তিনি সর্বদা তরবারির উপর ভর দিয়ে খুতবা দিয়েছেন-যা ইঙ্গিত করে যে এই দীনে-ইসলাম তরবারির দ্বারা কায়েম হয়েছে- চরম মূর্খতার ফলেই তারা এরূপ বলে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এমন কোনো বর্ণনা আসেনি যে তিনি তরবারি, ধনুক অথবা অন্য কিছু নিয়ে মিন্বারে উঠতেন। এমনকী মিন্বার নির্মাণের পূর্বেও যে তিনি তরবারি হাতে নিয়ে খুতবা দিয়েছেন, এ কথা কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায় না। মিন্বার নির্মাণের পূর্বে তিনি লাঠি বা ধনুকের উপর ভর দিতেন।‘ [ যাদুল মাআদ : ১/৪২৯ ]
শায়খ ইবনে উসাইমীন র. বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তরবারি, ধনুক অথবা লাঠির উপর ভর দিয়ে খুতবা দিতেন একথা প্রমাণের পক্ষে যে হাদিস উল্লেখ করা হয় তা সন্দেহযুক্ত। যদি ধরেও নিই যে হাদিসটি সহিহ, তবুও ইবনুল কাইয়েম র. বক্তব্য বিষয়টি পরিষ্কার করে দিচ্ছে। তিনি বলেছেন: মিন্বার নির্মাণের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কিছুর উপর ভর দিয়েছেন বলে কোনো বর্ণনায় আসেনি।
এর ব্যাখ্যায় বলা যায়: কোনো কিছুর উপর ভর দেয়া প্রয়োজনের সময় হতে পারে। উদাহরণত খতিব যদি এমন দুর্বল হয় যে তাকে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতে হবে, তবে সে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়াবে। এবং এসময় তা সুন্নত বলে পরিগণিত হবে। কেননা তা দাঁড়ানোর ব্যাপারে সাহায্য করে। আর খুতবার সময় দাঁড়ানো সুন্নত। পক্ষান্তর যদি প্রয়োজন না থাকে তাহলে লাঠি বহনের আদৌ দরকার নেই। [ আশশারহুল মুমতে: ৫/৬২-৬৩ ]
শায়খ আলবানি র. ইবনুল কাইয়েম র. এর কথা সমর্থন করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা দেয়ার সময় ধনুক অথবা লাঠির উপর ভর দিতেন এ কথা তিনি অস্বীকার করেছেন। [ দ্র: আসসিললাতুয যায়িফা : ৯৬৪ ]
আল্লাহই উত্তম জ্ঞানী।
শিরোনাম: নির্দিষ্ট পাত্রে পান করা প্রসঙ্গে
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2নির্দিষ্ট পাত্রে পান করা প্রসঙ্গে
প্রশ্ন: আমি এক মসজিদে ছিলাম, সেখানে তাবলীগের একটি জামাত আসে। খানার সময় তাদের সাথে বসে দেখলাম পান করার জন্য নির্দিষ্ট পাত্র তারা সাথে নিয়ে এসেছে। বাটির মত গোলাকার, প্রায় আধা লিটার বা সামান্য কম পানি ধরে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম গ্লাসের পরিবর্তে এ পাত্র কেন? তাদের থেকে একজন বলল: এতে পান করা সুন্নত। ব্যাপারটা আমার নিকট একেবারে নতুন ও আশ্চর্য ঠেকল! নির্দিষ্ট কোন পাত্রে পান করা কি সুন্নত? জানিয়ে বাধিত করবেন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
উত্তর: নির্দিষ্ট কোন পাত্রে পান করা সুন্নত নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন তা অনুসরণ করে যে কোন পাত্রে বা যেভাবে সম্ভব পান করা সুন্নত স্বর্ণ-রূপার পাত্র ব্যতীত। নির্দিষ্ট আকৃতির পাত্রে পান করা সুন্নত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়। এটা মানুষের সাধ্যেরও অতীত, কারণ এর অর্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে জাতীয় পাত্রে পান করেছেন তাতে পান করা। এটা নির্দিষ্ট আকৃতির হতে পারে যেমন প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে, আবার নির্দিষ্ট ধাতুর তৈরিও হতে পারে বা উভয় অর্থাৎ নির্দিষ্ট ধাতুর তৈরি নির্দিষ্ট আকৃতির পাত্র। আমরা দেখছি স্থান-কাল ও মানুষের পছন্দের ভিন্নতার কারণে এসব বস্তুতে নিত্য পরিবর্তন আসছে, যা মানুষের স্বভাব ও আল্লাহর দেয়া প্রকৃতি। মক্কা-মদিনায় যেসব পাত্র রয়েছে অন্যত্র তা নাও থাকতে পারে। তাই ইসলাম নির্দিষ্ট কোন পাত্রে পান করার বিধান দেয় নি। কতক পদ্ধতি বাতলে দিয়েছে তা অনুসরণ করে পান করাই সুন্নত। যেমন স্বর্ণ-রূপার পাত্রে পান না করা, পান করার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা, ডান হাতে পান করা, প্রয়োজন ব্যতীত দাঁড়িয়ে পান না করা ইত্যাদি।
স্বর্ণ-রূপার পাত্রে পান করা নিষেধ:
উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الَّذِي يَشْرَبُ فِي إِنَاءِ الْفِضَّةِ إِنَّمَا يُجَرْجِرُ فِي بَطْنِهِ نَارَ جَهَنَّمَ») متفق عليه. وفي رواية لـمسلم : (إن الذي يأكل أو يشرب في آنية الفضة والذهب...
“রূপার পাত্রে যে পান করে, সে মূলত তার পেটে জাহান্নামের আগুন গলাধঃকরণ করে”। [বুখারি: (৫২৩০), মুসলিম: (৩৮৫৩)] হাদিসটি বুখারি থেকে নেয়া। আলি ইব্ন মুসহির সূত্রে মুসলিমের অপর বর্ণনায় রয়েছে: “যে ব্যক্তি স্বর্ণ ও রূপার পাত্রে খায় অথবা পান করে...”। অর্থাৎ যে স্বর্ণ-রূপার পাত্রে পান করে সে নিজের ওপর জাহান্নাম অবধারিত করে। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, স্বর্ণ ও রূপার পাত্র ব্যতীত তামা, পিতল, সীসা, মাটি অথবা অন্য কোন ধাতব পদার্থের তৈরি পবিত্র পাত্রে পান করা বৈধ। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ هُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي ٱلۡأَرۡضِ جَمِيعٗا ٢٩ ﴾ [البقرة: ٢٩]
“তিনিই যমীনে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন”। [সূরা আল-বাকারা: (২৯)]
পান করার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা:
ওমর ইব্ন আবু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়িতে বড় হই, আমার হাত খাবারের পাত্রে এদিক সেদিক যেত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
«يَا غُلَامُ، سَمِّ اللَّهَ وَكُلْ بِيَمِينِكَ وَكُلْ مِمَّا يَلِيكَ، فَمَا زَالَتْ تِلْكَ طِعْمَتِي بَعْدُ»
“হে বৎস, বিসমিল্লাহ বল, ডান হাতে খাও এবং তোমার সামনে থেকে খাও। অতঃপর তাই আমার খাওয়ার নিয়মে পরিণত হল”। [বুখারি: (৪৯৮২), মুসলিম: (৩৭৭৪)]
ডান হাতে পান করা:
ইব্ন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَأْكُلْ بِيَمِينِهِ وَإِذَا شَرِبَ فَلْيَشْرَبْ بِيَمِينِهِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْكُلُ بِشِمَالِهِ وَيَشْرَبُ بِشِمَالِهِ».
“যখন তোমাদের কেউ খায়, যেন ডান হাতে খায় এবং যখন পান করে, যেন ডান হাতে পান করে, কারণ শয়তান বাঁ হাতে খায় ও বাঁ হাতে পান করে”। [মুসলিম: (৩৭৭১), আবু দাউদ: (৩২৮৫)]
প্রয়োজন না হলে বসে পান করা:
আনাস ইব্ন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন:
«أَنَّهُ نَهَى أَنْ يَشْرَبَ الرَّجُلُ قَائِمًا»، قَالَ قَتَادَةُ فَقُلْنَا: فَالْأَكْلُ فَقَالَ: «ذَاكَ أَشَرُّ أَوْ أَخْبَثُ».
“তিনি কোন ব্যক্তির দাঁড়িয়ে পান করাকে নিষেধ করেছেন”। কাতাদা রহ. বলেন: আমরা বললাম: [দাঁড়িয়ে] খাওয়া কেমন? তিনি [আনাস] বললেন: “দাঁড়িয়ে খাওয়া আরো খারাপ অথবা আরো নিন্দনীয়”। হাদিসটি আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ইমাম মুসলিম রহ. বর্ণনা করেছেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদিম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনায় আগমনের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দশ বছর তিনি খিদমত করেছেন। দশ বছর বয়সে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে এসেছিলেন। তিনি দেখেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে খেতেন ও বসে পান করতেন। তিনিই বর্ণনা করছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: দাঁড়িয়ে খাওয়া কেমন? তিনি বললেন: দাঁড়িয়ে খাওয়া আরো খারাপ আরো নিন্দনীয়।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ইমাম মুসলিম রহ. অপর এক হাদিস বর্ণনা করেন:
«لَا يَشْرَبَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمْ قَائِمًا فَمَنْ نَسِيَ فَلْيَسْتَقِئْ»
“তোমাদের কেউ যেন দাঁড়িয়ে পান না করে, যে ভুলে গেল সে যেন বমি করে ফেলে দেয়”। [মুসলিম: (৩৭৮২)] দাঁড়িয়ে পান করার এসব নিষেধাজ্ঞা আদবের অন্তর্ভুক্ত এবং স্বাভাবিক হালতে প্রযোজ্য, যেন মানুষ বসে পান করার অভ্যাস গড়ে তুলে। যেমন খায়বর যুদ্ধ শেষে ক্ষুধা ও ক্লান্তি দূর করার জন্য সাহাবিগণ গাধার গোস্ত চুলায় চড়ান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন কি পাকাও? তারা বলল: গাধার গোস্ত। অতঃপর তিনি বললেন:
«أَهْرِقُوهَا وَاكْسِرُوهَا» فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَوْ نُهَرِيقُهَا وَنَغْسِلُهَا قَالَ: « أَوْ ذَاكَ»
“এগুলো ঢেলে ফেলে দাও এবং পাত্রগুলো ভেঙ্গে ফেল”। এক ব্যক্তি বলল: হে আল্লাহর রাসূল, অথবা আমরা গোস্ত ফেলে দিয়ে পাত্র ধুয়ে নেই। তিনি বললেন: “অথবা তাই কর”। [বুখারি: (৫৭০৯)] যদিও ভাষা কঠোর, কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞা আদব শিক্ষা দেয়া ও অভ্যাস গড়ে তুলার অন্তর্ভুক্ত, ওয়াজিব ও অবশ্য করণীয় নয়। ওয়াজিব হলে দ্বিতীয় আদেশে কখনো তিনি পাত্র ধুয়ে ব্যবহার করার অনুমতি প্রদান করতেন না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন: “দাঁড়িয়ে পান করার চেয়ে বসে পান করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কারণ বসে পান করলে আস্তে আস্তে পানি নিচে অবতরণ করে, কিন্তু দাঁড়িয়ে পান করলে দ্রুত ও চাপ সৃষ্টি করে পানি নিচে নামে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর”। সুবহানাল্লাহ! যার মধ্যে কল্যাণ রয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তারই নির্দেশ দিয়েছেন এবং যাতে অনিষ্ট রয়েছে তা থেকেই আমাদেরকে নিষেধ করেছেন।
প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পান করা বৈধ:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবি হাস্সান ইব্ন সাবেতের বোন, কাবশাহ বিন্তে সাবেত [উপনাম: উম্মে সাবেত] বর্ণনা করেন:
«دَخَلَ عَلَيَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ فَشَرِبَ مِنْ فِي قِرْبَةٍ مُعَلَّقَةٍ وَهُوَ قَائِمٌ».
“একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট আগমন করেন, অতঃপর তিনি ঝুলন্ত মশকের মুখ থেকে দাঁড়িয়ে পান করনে ...”। [তিরমিযি: (১৩৬২)] এ থেকে প্রমাণ হয় প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পান করা কিংবা মশক থেকে সরাসরি পান করা বৈধ। নিষেধাজ্ঞা হচ্ছে বিনা প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পান করার ক্ষেত্রে।
ইব্ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«سَقَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ زَمْزَمَ فَشَرِبَ وَهُوَ قَائِمٌ» قَالَ عَاصِمٌ: فَحَلَفَ عِكْرِمَةُ مَا كَانَ يَوْمَئِذٍ إِلَّا عَلَى بَعِيرٍ
“আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যমযমের পানি পান করিয়েছি, তিনি তা দাঁড়িয়ে পান করেন”। আসেম বলেন, ইকরিমা শপথ করে বলেন, তিনি তো সেদিন উটের উপরই ছিলেন।[বুখারি: (১৫৩৫), মুসলিম: (৩৭৮৩)]
জাবের ইব্ন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে বলেন:
«إِنْ كَانَ عِنْدَكَ مَاءٌ بَاتَ هَذِهِ اللَّيْلَةَ فِي شَنَّةٍ وَإِلَّا كَرَعْنَا».
“যদি তোমার কাছে রাতে রাখা মশকের পানি থাকে ভাল, অন্যথায় আমরা চুমুক দিয়ে পান করে নিব”। [বুখারি: (৫২০৯)] এ থেকে প্রমাণ হয় যে, পান করার জন্য যদি ছোট পাত্র না পাওয়া যায়, অথবা সংগ্রহে কষ্ট হয়, অথবা মশকে রাখা অবশিষ্ট পানির সম্পূর্ণ পান করার ইচ্ছা হয়, অথবা এমন কেউ হয় যার ঝুটা ও মুখে দেয়া মশক থেকে কেউ পান করতে অপছন্দ করবে না, যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাহলে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে মশক বা পানির বড় পাত্র থেকে সরাসরি পান করা বৈধ। অযথা পাত্র সংগ্রহের জন্য কাউকে কষ্ট দেয়া বা নিজে কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিনয়, নম্রতা ও আল্লাহর প্রতি দাসত্ব প্রকাশ পায়। অনুরূপ পুকুর বা নদী থেকে হাত ও পাত্রের সাহায্য ব্যতীত সরাসরি মুখ দ্বারা পান করাও বৈধ। এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ সময় মশকে রাখা পানি পছন্দ করতেন। কারণ দীর্ঘ সময় মশকে থাকার ফলে পানিতে মিশে থাকা মাটি-বালু ইত্যাদি নিচে নেমে পানি পরিষ্কার হয়ে যায়। এ জন্য মানুষেরা সকালে পান করার জন্য রাতে পানি সংগ্রহ করে রাখত, তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের পানি তালাশ করেছেন। আল্লাহ ভাল জানেন।
মুফতী : মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2মীলাদুন্নবী ও জন্ম দিনের সিয়াম পালন করা
প্রশ্ন :
মীলাদুন্নবীর দিন সিয়াম পালন করা কি বৈধ, যেমন সহীহ মুসলিম, নাসায়ী ও আবু দাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবার দিনের সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি বলেন : এ দিন আমি জন্ম গ্রহণ করছি... এ হাদীসের ভিত্তিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইত্তেবায় কোন ব্যক্তির নিজের জন্ম দিনে সিয়াম পালন করা কি বৈধ ? আশা করছি বিষয়টি স্পষ্ট করবেন।
উত্তর :
আল-হামদুলিল্লাহ
প্রথমত :
তিরমিযীতে ইমাম মুসলিম আবু কাতাদা আল-আনসারী থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবার দিনের সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি বলেন : "এ দিন আমি জন্ম গ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমার উপর ওহি নাযিল করা হয়েছে।” মুসলিম : (১১৬২) ইমাম তিরমিযি আবু হুরায়রা -রাদিআল্লাহু আনহু- থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমল পেশ করা হয়, আমি চাই সিয়াম অবস্থায় আমার আমল পেশ করা হোক।” তিনি হাদিসটি হাসান বলেছেন। আল-বানি সহীহ তিরমিযীতে হাদিসটি সহীহ বলেছেন।
উপরের বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্মের শোকর আদায় কল্পে সোমবার দিন সিয়াম পালন করেছেন। আবার এ দিনের ফজিলতের কারণেও তিনি সিয়াম পালন করেছেন, যেমন এ দিনেই তার উপর ওহি নাযিল করা হয়েছে এবং দিনেই বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়, তাই তিনি পছন্দ করেন, তার আমল সিয়াম অবস্থায় পেশ করা হোক। অতএব সোমবার দিন সিয়াম পালন করার কয়েকটি কারণের একটি কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম।
এ হিসেবে কেউ যদি সোমবার দিন সিয়াম পালন করে, যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়াম পালন করেছেন, এতে আল্লাহর মাগফেরাত কামনা করে, আল্লাহর নি‘আমতের শোকর আদায় ইচ্ছা করে, যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ও নবুওয়তের নি‘আমত এবং সে এ দিনে মাগফেরাত প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করে, তাহলে ভাল, এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতও বটে। কিন্তু এর জন্য এ সপ্তাহ নয় অমুক সপ্তাহ, এ মাস নয় অমুক মাস নির্দিষ্ট করা যাবে না, বরং জীবনের প্রতি সোমবারেই সাধ্যমত সিয়াম পালন করার চেষ্টা করা।
তবে মীলাদুন্নবী উপলক্ষে বছরের শুধু একটি দিন সিয়ামের জন্য নির্দিষ্ট করা বিদআত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত বিরোধী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার দিন সিয়াম পালন করেছেন। হাদিসে এ দিনটিই নির্দিষ্ট। আর এ দিনটি বছরের প্রতি সপ্তাহে বিদ্যমান।
দ্বিতীয়ত :বর্তমান মানুষেরা যে ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করছে ও তার জন্য মাহফিলের আয়োজন করছে, এসব বিদআত ও নাজায়েজ। মুসলিমদের আনন্দ-উৎসবের জন্য ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ব্যতীত অন্য কোন ঈদ নেই।
এরপরও কোথায় মীলাদুন্নবী, যা প্রকৃত পক্ষেই নি‘আমত, সকল মানব জাতির জন্য রহমত, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন : "আর আমি তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” [সূরা আম্বিয়া : ১০৭] আর কোথায় অন্যান্য লোকের জন্ম ও মৃত্যু !? কোথায় ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম?! কোথায় ছিলেন তাদের পরবর্তী নেককার লোকেরা ?! এই আমাল থেকে ?! যদি নিজের জন্ম দিনের শোকর আদায় উপলক্ষে সিয়াম পালন করা বৈধ হতো, তাহলে অবশ্যই তারা তা পালন করতেন।
তাদের কারো থেকে প্রমাণিত নেই যে, সপ্তাহের কোন একদিন, অথবা মাসের কোন একদিন, অথবা বছরের কোন একদিন, অথবা নির্দিষ্ট কোন এক দিনকে তারা নিজের জন্ম দিন উপলক্ষে ঈদ পালন করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত যদি অন্য কারো জন্ম দিন উপলক্ষে সিয়াম পালন করা সাওয়াবের কাজ হতো, তাহলে আমাদের পূর্বে তারাই এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন, যারা অন্যান্য সকল কল্যাণে আমাদের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। তারা যেহেতু তা করেননি, এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, এসব আমল বিদআত, এর উপর আমল করা বৈধ নয়। আল্লাহ ভাল জানেন।
সমাপ্ত
মুফতী : মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2মীলাদুন্নবীর মিষ্টি ক্রয় করা
প্রশ্ন : মীলাদুন্নবীর মিষ্টি খাওয়া কি হারাম, মাহফিলের আগের দিন, পরের দিন এবং মাহফিলের দিন, এ উপলক্ষে মিষ্টি খরিদ করার বিধান কী ? কারণ ইদানীং এর প্রচল দেখছি, আশা করছি উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর : আল-হামদুলিল্লাহ
প্রথমত :
মীলাদুন্নবী বিদআত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অথবা তার কোন সাহাবি অথবা কোন তাবেঈ অথবা কোন ইমাম থেকে এর প্রচলন নেই, বরং এর প্রচলন শুরু করেছে আবিদী সম্প্রদায়, যেরূপ তারা অন্যান্য বিদআত ও গোমরাহী সৃষ্টি করেছে।
দ্বিতীয়ত :
ক্ষতিকর কোন উপাদান না থাকলে মিষ্টি খাওয়া ও কেনা বৈধ, যদি এতে নিষিদ্ধ কর্মের প্রতি উৎসাহ না থাকে অথবা নিষিদ্ধ কর্মের প্রচার ও স্থায়িত্বের কারণ না হয়।
তবে আমাদের কাছে স্পষ্ট যে, মীলাদুন্নবীর সময় মিষ্টি খরিদ করা মীলাদুন্নবী প্রচার করা এবং তার প্রতি এক ধরণের সমর্থন, বরং প্রকারান্তরে মীলাদুন্নবী উদযাপন করা হয়। কারণ, মানুষের অভ্যাসে যা পরিণত হয় তাই ঈদ, যদি তাদের অভ্যাস হয় এ দিনে এ ধরণের খাদ্য ভক্ষণ করা, অথবা মীলাদুন্নবী উপলক্ষে মিষ্টি তৈরি করা, বছরের অন্যান্য দিন যেরূপ হয় না, তাহলে এ দিনে এ মিষ্টি বিকিকিনি করা, খাওয়া অথবা হাদিয়া দেয়া এক ধরণের মীলাদ মাহফিল উদযাপন করার শামিল, তাই এ দিনে এসব পরিহার করাই উত্তম।
এ বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি : ভালবাসা দিবসের সাথে সম্পৃক্ত যাবতীয় বস্তু এবং ভালবাসা দিবস উদযাপনের নিদর্শন লাল রঙের মিষ্টি ক্রয় ও হৃদপিণ্ডের ছবি সম্বলিত জিনিস আদান-প্রদান, ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহার সম্পর্কে ‘লাজনায়ে দায়েমার’ ফতোয়ার প্রতি :
“কুরআন-হাদিসের স্পষ্ট দলিল ও উম্মতের ঐক্য মত যে, ইসলামের ঈদ দু’টি : ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। এ ছাড়া অন্যান্য ঈদ বেদআত, হোক না তা কোন ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত অথবা কোন দলের সাথে সম্পৃক্ত অথবা কোন ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত অথবা অন্য কোন জিনিসের সাথে সম্পৃক্ত। কোন মুসলমানের পক্ষে এসব ঈদ পালন করা, সমর্থন করা, এতে আনন্দ প্রকাশ করা ও কোনভাবে এর সহযোগিতা প্রদান করা বৈধ নয়। কারণ এগুলো আল্লাহর সীমা রেখার লঙ্ঘন, আর যে আল্লাহর সীমালঙ্ঘন করল সে নিজের উপরই যুলম করল। অনুরূপ যে কোন জিনিসের মাধ্যমে এ ঈদ বা এ ধরণের অন্যান্য ঈদে সাহায্য করা হয় তাও হারাম, যেমন খাওয়া অথবা পান করা অথবা বিক্রি করা অথবা কেনা অথবা তৈরি করা অথবা হাদিয়া দেয়া অথবা প্রেরণ করা অথবা প্রচার করা ইত্যাদি। কারণ এসবের মধ্যে রয়েছে গুনা, অবাধ্যতা এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধাচরণে সহযোগিতা প্রদান করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
ﯭ ﯮ ﯯ ﯰﯱ ﯲ ﯳ ﯴ ﯵ ﯶﯷ ﯸ ﯹﯺ ﯻ ﯼ ﯽ ﯾ ﯿ
সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ আযাব প্রদানে কঠোর”। সূরা মায়েদা : (২)” আল্লাহ ভাল জানেন।
সমাপ্ত
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সশরীরে এসে সাক্ষাত করেন, এমন ধারণা পোষণকারী ব্যক্তিকে কিভাবে প্রতিবাদ করব
প্রশ্ন :
পাকিস্তানে কতক সূফী রয়েছে, এরা মূলত সকল অনিষ্টের মূল, আমি তাদের এক আলেম নামধারী ব্যক্তিকে বলতে শোনে হতবাক হয়ে গেছি, সে বলে : তোমরা বাস্তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত লাভ করতে পার ? তার উদ্দেশ্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সশরীরে জীবিত এসে তার ওলীদের সাথে সাক্ষাত করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেছেন তারা শুধু এটা অবিশ্বাসই করে না, বরং তারা বলে : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্তমানেও তার ওলীদের সাথে জীবিত সশরীরে এসে সাক্ষাত করেন। আমরা তাদেরকে কিভাবে প্রতিবাদ করব ? ইসলামী শরী'আতে এর হুকুম কী ?
উত্তর :
আল-হামদুলিল্লাহ
বিদ‘আত প্রতিরোধ করা অথবা কারো ভুল সংশোধন করার উত্তম পন্থা হচ্ছে তার কাছে দলিল সম্পর্কে জানতে চাওয়া। যার কথা বা দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে দলিল চাওয়া হয়, সে অবশ্যই নিজের বিষয়টি গভীর মনোযোগ ও বিবেক দিয়ে যাচাই করে, সঠিক দলিল ও নির্ভুল নিয়ম অনুসরণ করে, ধারণা বা শ্রুত কোন ঘটনার ভিত্তিতে নয়। এ প্রসঙ্গে সকলে একমত যে, এ বিষয়গুলো দ্বীনি ও ধর্মীয়, অতএব এসব বিষয়ে সকলের কর্তব্য দলিল উপস্থাপন করা এবং দলিলের ভিত্তিতে এসব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা।
এরা জাগ্রত অবস্থায় সরাসরি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখার দাবি করে :
তারা হয়তো বলে : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রূহসহ সশরীরে জীবিত, যেখানে ইচ্ছা যাওয়া-আসা এবং যেরূপ ইচ্ছা নড়াচড়া করেন, যেমন ছিলেন তিনি জীবিত অবস্থায়, অনুরূপ এখনো।
অথবা তারা বলে : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেছেন, অর্থাৎ তিনি তার বারযাখি জগত তথা কবরের বিশেষ হায়াতে চলে গেছেন, যে হায়াত একমাত্র তার সাথেই খাস, যদি কেউ তাকে দেখে, মূলত তার সামনে তার আকৃতি ভেসে উঠে সেখান থেকেই।
উভয় অবস্থায় তারা দলিল পেশ করতে বাধ্য, কুরআন অথবা সুন্নত অথবা উম্মতের ইজমা থেকে। তারা যেসব দলিল বর্ণনা করে, তা আমরা খতিয়ে দেখেছি, যার সারাংশ কতক ওলী ও নেককার লোকের ঘটনা এবং তাদের উল্লেখ করা প্রত্যক্ষদর্শী কতক লোকের নাম। সন্দেহ নেই, এসব ঘটনা দলিল হিসেবে পেশ করার উপযুক্ত নয়। দলিল হয়তো কুরআনের আয়াত অথবা হাদিস অথবা উম্মতের ইজমা অথবা ন্যূনতম পক্ষে কোন সাহাবির বাণী হবে, কিসসা বা ঘটনা নয়। বিশেষ করে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্ব ও ইলমে গায়েবের সাথে তার সম্পৃক্ততার বিষয় হয়।
তাদের বর্ণিত এসব কিসসা-কাহিনীর ব্যাপারে আমি বলতে চাই, এতে নানা সম্ভাবনা বিদ্যমান : হয়তো এসব ঘটনা কখনোই সংঘটিত হয়নি, তারা শুধু নিজেদের কল্পনা প্রকাশ করেছে, অথবা এসব ঘটেছে তাদের স্বপ্নে দিবালোকে নয়, এমনও হতে পারে শয়তান নিজের আকৃতি পরিবর্তন করে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আকৃতির ধান্ধা দিয়েছে, অথবা এগুলো ছিল তাদের চিন্তার ভেলকিবাজি, যা তারা বাস্তব ধরে নিয়েছে।
আর আমরা যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাস্তবে দেখার বিপক্ষে দলিল পেশ করতে সক্ষম হই, -ধ্যানে বা খেয়ালে দেখার বিপক্ষে নয়, তাহলে এসব সম্ভাবনাই জোরদার হয়, বলার অপেক্ষা রাখে না।
আবু বকর সিদ্দীক -রাদিআল্লাহু আনহু- বলেন : “জেন রেখ, যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদাত করত, নিশ্চয় মুহাম্মদ মারা গেছেন, আর যে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাত করত, আল্লাহ চিরঞ্জীব তিনি কখনো মারা যাবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ
'নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল'। [সূরা যুমার : ৩০]
সূরা আলে-ইমরানে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئاً وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ
'আর মুহাম্মদ কেবল একজন রাসূল। তার পূর্বে নিশ্চয় অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি সে মারা যায় অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে ? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন'। [সূরা আলে-ইমরান : ১৪৪] [বুখারী : ৩৬৬৭]
সাহাবায়ে কেরাম, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অতি নিকটবর্তী ছিলেন, তাকে অধিক মহব্বত করতেন এবং তার আনুগত্যে নিজেদের উৎসর্গ করে দিতেন, তারা যদি মৃত্যুর অর্থ অনুধাবন করতে পারেন, অর্থাৎ তার সাথে দুনিয়াতে আর কখনো সাক্ষাৎ সম্ভব নয় জানেন, তাহলে এরা কিভাবে ধারণা করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে, তাদের সাথে উঠাবসা করে ?!
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন :
“এসব ক্ষেত্রে তাদের কিছু শয়তানি ধান্ধা ও আসর হাসিল হয়, যা তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে কারামত মনে করে। তাদের কেউ দেখে যে, কবরস্থ ব্যক্তি তার কাছে এসেছে, -অথচ বহু বছর পূর্বে সে মারা গছে- এবং বলছে : আমি অমুক। অনেক সময় তাকে বলে : আমরা এমন লোক, আমাদেরকে যখন কবরে রাখা হয় আমরা উঠে আসি। এমনি ঘটনা ঘটেছে তুনসি ও নুমান সালামির সাথে। আর শয়তান তো অহরহ মানুষের আকৃতি ধারণ করে, তাদেরকে ঘুমন্ত ও ও সজাগ উভয় অবস্থায় ধোঁকা দেয় ও প্রতারিত করে।
অনেক সময় অপরিচিত লোকের নিকট এসে বলে : আমি অমুক বুযুর্গ অথবা আমি অমুক আলেম। অনেক সময় তাদেরকে বলে : আমি আবু বকর, আমি ওমর। আবার অনেক সময় জাগ্রত অবস্থায় এসে বলে : আমি মাসীহ, আমি মূসা, আমি মুহাম্মদ।
এ জাতীয় আরও অনেক ঘটনা আমি জানি, আর এ থেকে অনেকে বিশ্বাস করে নেয় যে, নবীগণ নিজ আকৃতিতে জাগ্রত অবস্থায় তাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য এসেছেন।
এদের কতক শায়খ আছেন, যাদের মুজাহাদা, ইলম, তাকওয়া ও দ্বীনদারী প্রসিদ্ধ, তারা সরল মনে এসব ঘটনা বিশ্বাস করে নেয়।
এদের মধ্যে কতক রয়েছে, যে ধারণা করে, যখন সে নবীর কবর যিয়ারত করতে আসে, তখন তিনি সশরীরে কবর থেকে বের হয়ে তার সাথে কথা বলেন। এদের কেউ কাবার সীমানায় জনৈক শায়খের চেহারা দেখে বলে : তিনি ইবরাহিম খলিল।
এদের কেউ ধারণা করে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হুজরা থেকে বের হয়ে তার সাথে কথা বলেছেন। এটা সে নিজের কারামাত মনে করে। এদের কারো বিশ্বাস : কবরস্থ ব্যক্তিকে আহ্বান করলে সে ডাকে সাড়া দেয়।
এদের কেউ বর্ণনা করত : ইব্ন মুনদাহ কোন হাদিস সম্পর্কে সমস্যায় পড়লে, হুজরায় প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করত, আর তিনি তার উত্তর দিতেন। সর্বশেষ এমন ঘটনা মরক্কোর এক ব্যক্তির ঘটে, অতঃপর সে এ ঘটনাকে নিজের কারামাত গণ্য করে।
এসব ধারণা পোষণকারী সম্পর্কে ইব্ন আব্দুল বারর বলেছেন : তুমি নিপাত যাও! এসব ঘটনা তুমি মুহাজির ও আনসার সম্পর্কে জান ? তাদের মধ্যে এমন কেউ ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর যে তাকে জিজ্ঞাসা করেছে, আর তিনি তার উত্তর দিয়েছেন ?
সাহাবায়ে কেরাম কত বিষয়ে মত বিরোধ করেছে, তারা কেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেনি ?! এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে ফাতেমা মিরাসের ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেন, তিনি কেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেননি ?” “মাজমুউল ফতোয়া” : (১০/৪০৬-৪০৭)
ইব্ন তাইমিয়্যাহ -রাহিমাহুল্লাহ- আরও বলেন :
“এর দ্বারা বলা উদ্দেশ্য যে, সাহাবায়ে কেরামদের গোমরাহ করার জন্য শয়তান এসব স্পষ্ট কুফরি পেশ করার সাহস করেনি, যেরূপ সাহস এসব গোমরাহ ও বিদআতিদের ক্ষেত্রে করেছে, এরা কুরআনের অপব্যাখ্যা করেছে, অথবা এরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল, অথবা এরা অস্বাভাবিক আশ্চর্য কিছু শ্রবণ করেছে ও দেখেছে, আর তাকেই মনে করেছে যে, এগুলো নবী ও নেককার লোকের আলামত, অথচ এগুলো ছিল শয়তানের কারসাজি। খ্রিষ্টান ও বিদ‘আতি সম্প্রদায় এভাবেই পথভ্রষ্ট হয়েছে। তারা মুতাশাবেহ আয়াতের (যার অর্থ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না) অনুসরণ করে, আর দাবি করে এগুলো মুহকাম (স্পষ্ট অর্থের ধারক), অনুরূপ তারা যুক্তি ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দলিল আঁকড়ে থাকে, অতঃপর কিছু শোনে ও দেখে বলে : এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে, অথচ তা শয়তানের পক্ষ থেকে, আর তারা দাবি করে এগুলো স্পষ্ট সত্য এতে কোন অস্পষ্টতা নেই।
অনুরূপ সাহাবাদের ক্ষেত্রে শয়তান এমন সাহস করেনি, তাদের সামনে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আকৃতি ধারণ করবে, অথবা তার নিকট ফরিয়াদ করবে, অথবা তাদের নিকট এমন আওয়াজ পেশ করারও সাহস দেখায়নি, যে আওয়াজ তার আওয়াজের ন্যায়, কারণ যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছে, তারা নিশ্চয় জানে এসব শিরক ও হারাম।
এ জন্য শয়তান তাদের কাউকে এও বলতে সাহস করেনি : তোমাদের কারো প্রয়োজন হলে আমার কবরের নিকট আস, আমার উসিলা দিয়ে ফরিয়াদ কর, না তার জীবদ্দশায় না তার মৃত্যুর পর। পরবর্তী যুগের লোকের ক্ষেত্রে যেরূপ ঘটেছে।
শয়তান তাদের কারো নিকট এসে এও বলার সাহস করেনি : আমি অদৃশ্য ব্যক্তি, অথবা আমি চতুর্থ আওতাদের অন্তর্ভুক্ত, অথবা সপ্তম আওতাদের অন্তর্ভুক্ত, অথবা চল্লিশ আওতাদের অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ তাদের কাউকে বলার সাহস করেনি : তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত, কারণ এগুলো ছিল তাদের নিকট অসার ও নিরর্থক। শয়তান তাদের কারো কাছে এসে বলার সাহস করেনি : আমি আল্লাহর রাসূল, অথবা কবর থেকে তাদের কাউকে সম্বোধন করারও সাহস করেনি, যেমন পরবর্তী যুগে অনেকের ক্ষেত্রে ঘটেছে, তার কবরের নিকট, অন্যদের কবরের নিকট, বরং যেখানে কবর নেই সেখানেও।
অনুরূপ ঘটনা মুশরিক ও কিতাবিদের ক্ষেত্রেও অনেক ঘটে, তারা দেখে মৃত্যুর পর তাদের কোন সম্মানিত ব্যক্তি এসে তাকে সম্মান করছে। যেমন হিন্দুরা তাদের শ্রদ্ধার পাত্র পুরোহিত বা অন্য কোন কাফের ব্যক্তিকে দেখে। যেমন নাসারাগণ তাদের শ্রদ্ধার পাত্র নবী, হাওয়ারী ও অন্যদের দেখে। অনুরূপ আহলে কেবলার পথভ্রষ্টরাও জাগ্রত অবস্থায় তাদের সম্মানিত ব্যক্তিদের দেখে : হয়তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অথবা অন্য কাউকে, তারা তাকে সম্বোধন করে, সেও তাদেরকে সম্বোধন করে। কখনো তার থেকে উপকৃত হয়, তাকে কোন হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আর সে তাদেরকে উত্তর দেয়। তাদের কাউকে এমন ধারণা দেয়া হয় যে, হুজরা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে এসেছেন, তার সাথে মু‘আনাকা করছেন তিনি এবং তার দুই সাথী। আবার তাদের কাউকে এমন ধারণা দেয়া হয় যে, তার সালাম কয়েক দিনের দূরত্বে ও অনেক দূর স্থানে পৌঁছে গেছে। এরূপ আরও অনেক ঘটনা জানি এবং যাদের সাথে ঘটেছে তাদের অনেককেই জানি। আমার নিকট এদের অনেকে এর সত্য সত্য বর্ণনা দিয়েছে, তাদের উল্লেখ করলে স্থান দীর্ঘায়িত হবে।
এরূপ ঘটনা অনেকেরই ঘটতে পারে, যেরূপ ঘটে নাসারা ও মুশরিকদের ক্ষেত্রে। তবে এদের অনেকে এ ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। আবার এদের অনেকের ক্ষেত্রে ঘটনা সত্য হলেও, তারা এটা আল্লাহর নিদর্শন মনে করে, আরও ধারণা করে এটা তার অন্তরের শুদ্ধতা ও দ্বীনদারীর কারণেই ঘটেছে, কিন্তু সে জানে না এটা শয়তানের পক্ষ থেকে, সে জানে না মানুষের জ্ঞানের স্বল্পতার সুযোগে শয়তান তাদেরকে গোমরাহ করে। যার একেবারেই সামান্য জ্ঞান, শয়তান তাকে শরী‘আতের স্পষ্ট খেলাফ করার নির্দেশ করে। আর যার মোটামুটি জ্ঞান রয়েছে, শয়তান তাকে তার জানা বিষয়ের মাধ্যমেই গোমরাহ করে, এটাই শয়তানের কাজ, সে যদিও মনে করে কিছু সে অর্জন করেছে, কিন্তু সে যে দ্বীন হারিয়েছে তার ক্ষতি এরচেয়ে ঢের বেশী।
এ জন্যই সাহাবাদের কেউ বলেনি : তার কাছে খিজির এসেছে, না মূসা, না ঈসা, আর না তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তর শুনেছেন।
ইব্ন ওমর -রাদিআল্লাহু আনহু- সফর থেকে এসেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম করতেন, কিন্তু কখনো তিনি বলেননি আমি উত্তর শুনেছি। অনুরূপ তাবেঈ বা তাদেরও অনুসারী কারো ক্ষেত্রে এরূপ ঘটেনি, বরং এসব ঘটেছে তাদেরও অনেক পরে।অনুরূপ সাহাবাদের কেউ তাদের ইখতিলাফি বিষয় বা ইলমী কোন সমাধানের জন্য তার কবরে যাননি, না চার খলিফা, না তাদের ব্যতীত অন্য কেউ, অথচ তাদের সাথেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্ক গভীর ছিল।
এমনকি ফাতেমা- রাদিআল্লাহু আনহা-কে পর্যন্ত শয়তান বলার সাহস করেনি, তুমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরে গিয়ে জিজ্ঞাসা কর, আপনার মিরাসের হুকুম কী ?
অনুরূপ অনাবৃষ্টির সময় শয়তান তাদেরকে এভাবে ধোঁকা দেয়ার সাহস করেনি : তার নিকট দোয়া প্রার্থনা কর, যেন তিনি বৃষ্টির জন্য দোয়া করেন। তাদেরকে এও বলেনি : তোমাদের বিজয়ের জন্য তার নিকট সাহায্যের দোয়া প্রার্থনা কর, আর না বলেছে তার নিকট ইস্তেগফার প্রার্থনা কর। তার জীবিতাবস্থায় যেরূপ তারা তার নিকট গিয়ে রোগ মুক্তির দোয়া চাইত, বিজয়ের জন্য দোয়া চাইত। তার মৃত্যুর পর শয়তান তাদেরকে এরূপ গোমরাহ করার সাহস করেনি, আর না এভাবে সাহস করেছি পরবর্তী তিন যুগে। এসব গোমরাহী তখনই সৃষ্টি হয়েছে, যখন তাওহীদ ও সুন্নতের ইলম হ্রাস পেয়েছে, তখনি তাদের গোমরাহ করার সুযোগ শয়তানের হাতে এসেছে, যেরূপ গোমরাহ করেছে নাসারাদের, যখন তাদের নিকট ঈসা ও তার পূর্ববর্তী নবীদের ইলম হ্রাস পেয়েছিল।” “মাজমুউল ফতোয়া” : (২৭/৩৯০-৩৯৩)
আল্লামা আলুসি -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন :
“কামেল লোকদের সম্পর্কে যা বলা হয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর তারা তাকে দেখেছেন, তাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, তার থেকে শিখেছেন, ইসলামের প্রথম যুগে কারো ব্যাপারে এরূপ ঘটেছে আমাদের জানা নেই।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর দ্বীনি ও দুনিয়াবি বিভিন্ন বিষয়ে সাহাবাদের মাঝে ইখতিলাফ হয়েছে, তাদের মধ্যে আবু বকর ও আলী -রাদিআল্লাহু আনহুমা- ছিলেন, যেসব সূফীদের সম্পর্কে এসব ঘটনা বর্ণনা করা হয়, তাদের সিলসিলা এদের দু'জন পর্যন্ত গিয়েই শেষ হয়, অথচ কোন প্রমাণ নেই যে, তাদের কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছেন অথবা তার থেকে শিখেছেন।
অনুরূপ আমাদের কাছে এমন প্রমাণও নেই যে, কোন সমস্যার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে সাহাবাদের সমাধান দিয়েছেন।
ওমর -রাদিআল্লাহু আনহু- থেকে প্রমাণিত, তিনি কোন বিষয়ে বলেছেন : আফসোস ! এ বিষয়ে যদি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করতাম!
আমাদের নিকট এমন প্রমাণও নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর ওমর -রাদিআল্লাহু আনহু- তার নিকট দু‘আর আবেদন করেছেন, যেমন কতক সূফীদের ব্যাপারে বর্ণনা করা হয়।
তুমি জান যে, তারা দাদার সাথে ভাইদের মিরাস বণ্টন সম্পর্কে ইখতিলাফ করেছে, কিন্তু তুমি কি জান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর থেকে বের হয়ে তার সমাধান দিয়েছেন ?!
তোমার নিকট নিশ্চয় পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর ফাতেমা -রাদিআল্লাহু আনহা- কিরূপ শোকে কাতর হয়েছিল, “ফিদাক”-এর মিরাস সম্পর্কে তার অবস্থা কেমন হয়েছিল, কিন্তু তুমি কি জান, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর থেকে বের হয়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন ও তার সমস্যা দূর করেছিলেন, যেমন সূফীদের ক্ষেত্রে ঘটে ?!
তুমি অবশ্যই জান যে, আয়েশা- রাদিআল্লাহু আনহা- বসরায় গিয়েছিলেন, যে কারণে সেখানে জামাল যুদ্ধ সংঘটিত হয়, কিন্তু তুমি জান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর থেকে বের হয়ে তাকে নিষেধ করেছেন, অথবা তাকে বিরত রেখেছেন ?! এ ধরণের আরও অনেক ঘটনা রয়েছে, যা গণনা করা সম্ভব নয়।
মুদ্দাকথা : আমাদের নিকট পৌঁছেনি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোন সাহাবি বা তার পরিবারের কোন প্রয়োজনে কবর থেকে বের হয়েছেন, অথচ তাদের এটা বেশী প্রয়োজন ছিল।
মসজিদে কুবার দরজার সামনে তার বের হওয়ার যে ঘটনা কতক শি'আ বর্ণনা করে, তাই শুধুই অপবাদ ও মিথ্যাচার।
সারকথা : পূর্ববর্তী নেককার লোকদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বের না হওয়া আর পরবর্তী লোকদের জন্য বের হওয়ার যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে, যার দ্বারা বিবেকবান সন্তুষ্ট হতে পারে”। রুহুল মা‘আনি : (২২/৩৮-৩৯)
শায়খ ইবন বাজ -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন :
“দ্বীনের অকাট্য প্রমাণ ও শরী‘আতের দলিল দ্বারা জানা গেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক জায়গায় বিদ্যমান নয়, তার শরীর শুধু তার কবরে মদিনা মুনাওয়ারায় বিদ্যমান। আর তার রূহ রফীকে ‘আলায় জান্নাতে বিদ্যমান। এর প্রমাণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস, তিনি মৃত্যুর সময় বলেছেন : “আল্লাহুম্মা ফির-রাফিকিল ‘আলা” তিনবার বলেন, অতঃপর তিনি মারা যান”।
সাহাবায়ে কেরাম ও তার পরবর্তী সকল উম্মত এ বিষয়ে একমত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার মসজিদের পাশে আয়েশার ঘরে দাফন করা হয়েছে। আজ পর্যন্ত তার শরীর সেখানেই বিদ্যমান। আর তার রূহ, অনুরূপ অন্যান্য নবী-রাসূল ও নেককার লোকদের রূহ জান্নাতে। কিন্তু তাদের প্রত্যেকের স্তর ও মর্যাদায় তারতম্য রয়েছে, তাদের ইলম ও ঈমান এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রে ধৈর্যের তারতম্য অনুরূপ।
কতক সূফী যেমন ধারণা করে, তিনি গায়েব জানেন এবং তাদের মীলাদ ইত্যাদিতে তিনি উপস্থিত হোন, এসব ভ্রান্ত আকীদা, এর পশ্চাতে কোন দলিল নেই, বরং কুরআন-হাদিস ও আদর্শ পূর্বসূরীদের সম্পর্কে মূর্খতাই তাদেরকে এ দিকে ধাবিত করেছে।
আল্লাহ তাদেরকে যে গোমরাহীতে লিপ্ত করেছেন, তা থেকে আমরা নিজেদের জন্য ও সকল মুসলিমের জন্য নিরাপত্তার প্রার্থনা করছি। অনুরূপ আল্লাহ তা‘আলার নিকট দোয়া করছি, তিনি আমাদেরকে সিরাতে মুস্তাকিম ও সঠিক পথে পরিচালিত করুন। নিশ্চয় তিনি শ্রবণ করেন, নিশ্চয় তিনি কবুল করেন”। (সংক্ষিপ্ত) “মাজমুউ ফতোয়া ইবন বাজ” : (৩/৩৮১-৩৮৩)
সমাপ্ত
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2মীলাদুন্নবী বিদআত সমর্থনকারীর প্রতিবাদ
প্রশ্ন :
নিম্নের বিষয়গুলোর প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি : বিষয়টি তর্ক বরং ঝগড়ার রূপ নিয়েছে, যারা বলে মীলাদুন্নবী বিদআত এবং যারা বলে মীলাদুন্নবী বিদআত নয় উভয় পক্ষের মধ্যে। যারা বলে মীলাদুন্নবী বিদআত, তাদের দলিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে অথবা সাহাবাদের যুগে অথবা কোন একজন তাবেঈর যুগে এ মীলাদুন্নবী ছিল না। অপরপক্ষ এর প্রতিবাদ করে বলে : তোমাদের কে বলেছে, আমরা যা কিছু করব, তার অস্তিত্ব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে অথবা সাহাবাদের যুগে অথবা তাবীঈদের যুগে থাকা চাই। উদাহরণত আমাদের যুগে হাদিস শাস্ত্রের দু’টি শাখা “রিজাল শাস্ত্র” ও “জারহু ও তাদিল শাস্ত্র” ইত্যাদি বিদ্যমান, এগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ছিল না, এ জন্য কেউ এর প্রতিবাদ করেনি। কারণ, নিষিদ্ধ হওয়ার মূল যুক্তি হচ্ছে নতুন আবিষ্কৃত বিদআত শরী‘আতের মূলনীতি বিরোধী হওয়া, কিন্তু মীলাদুন্নবী বা মীলাদ মাহফিল কোন মূলনীতি বিরোধী ? অধিকাংশ তর্ক এ নিয়েই সৃষ্টি হয়। তারা আরও দলিল পেশ করে যে, ইবন কাসির -রাহিমাহুল্লাহ- মীলাদুন্নবী সমর্থন করেছেন। দলিলের ভিত্তিতে বিশুদ্ধ কোনটি ?
উত্তর : আল-হামদুলিল্লাহ
প্রথমত :
প্রথমত জানা প্রয়োজন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম তারিখ নির্দিষ্টভাবে নির্ণয় সম্ভব হয়নি, এ ব্যাপারে আলেমদের বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। ইবন আব্দুল বারর মনে করেন, তিনি রবিউল আউয়াল মাসের দুই তারিখে জন্ম গ্রহণ করেছেন। ইবন হাজম প্রাধান্য দেন রবিউল আউয়াল মাসের আট তারিখ। কেউ বলেছেন রবিউল আউয়াল মাসের দশ তারিখ, যেমন আবু জাফর বাকের। কেউ বলেছেন রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ, যেমন ইবন ইসহাক। কেউ বলেছেন, তিনি রমযান মাসে জন্ম গ্রহণ করেছেন, যেমন ইবন আব্দুল বারর জুবাইর ইবন বাক্কার থেকে বর্ণনা করেছেন। দেখুন : “আস-সিরাতুন নববিয়াহ” পৃষ্ঠা : (১৯৯-২০০)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে আলেমদের এ মত বিরোধই প্রমাণ করে যে, এ উম্মতের শ্রেষ্ঠ জামাত ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অধিক মহব্বতকারী সাহাবায়ে কেরাম তার জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে নিশ্চিত ও চূড়ান্ত ছিলেন না, এ দিনটি পালন করা তো পরের কথা। এ দিন উদযাপন ছাড়াই মুসলমানদের কয়েক শতাব্দী গত হয়েছে, অবশেষে ফাতেমি নামে একটি বদদ্বীন ফেরকা এ দিনটির প্রচলন ও সূচনা করে।
শায়খ আলী মাহফুজ -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন :
“সর্বপ্রথম এ দিনটি উদযাপন করা হয় মিসরের কায়রোয় : ফাতেমি খলিফারা চতুর্থ শতাব্দীতে এর প্রচলন আরম্ভ করে। তারা ছয়টি মীলাদ বা জন্ম উৎসব প্রবর্তন করে : মীলাদুন্নবী, মীলাদে আলী -রাদিআল্লাহু আনহু-, মীলাদে ফাতেমাতুজ জোহরা- রাদিআল্লাহু আনহা-, মীলাদে হাসান ও হুসাইন- রাদিআল্লাহু আনহুমা- এবং বর্তমান খলিফার মীলাদ। সেই থেকেই তাদের দেশে এ মীলাদগুলো (জন্মানুষ্ঠান) যথারীতি পালন করা হচ্ছিল। অবশেষে এক সময়কার সেনাবাহিনী প্রধান আফজাল এসব মীলাদ রহিত করে দেন। খলিফা আমের বিআহকামিল্লাহ নিজ শাসনকালে পুনরায় এসব মীলাদ চালু করেন, অথচ মানুষ এসব মীলাদ ভুলতে আরম্ভ করেছিল। সপ্তম শতাব্দীতে “ইরবিল” শহরে সর্বপ্রথম এ মীলাদ আরম্ভ করেন বাদশাহ আবু সাঈদ, সেই থেকে আজ পর্যন্ত চলে আসছে তা, বরং তাতে আরও বৃদ্ধি ও সংযোজন ঘটেছে। তাদের রিপু ও প্রবৃত্তির চাহিদা মোতাবেক সব কিছু তারা এতে যোগ করেছে। তাদেরকে এর প্রত্যাদেশ করেছে মানব ও জিন শয়তানেরা”। “আল-ইবদা ফি মাদাররিল ইবতেদা” (পৃষ্ঠা নং: ২৫১)
দ্বিতীয়ত :
প্রশ্নে উল্লেখিত মীলাদুন্নবী উদযাপনকারীরা বলেছে : “তোমাদের কে বলেছে, আমরা যা কিছু করব, তার অস্তিত্ব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে অথবা সাহাবাদের যুগে অথবা তাবেঈদের যুগে থাকা চাই”। এর থেকে প্রকাশ পায় যে, তারা বিদআতের অর্থ জানে না, যে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বহু হাদিসে সতর্ক করেছেন। প্রশ্নে তারা যে মূলনীতি উল্লেখ করেছে, সে মূলনীতি হচ্ছে ইবাদাতের ক্ষেত্রে, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা হয়। অতএব এমন কোন ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যাবে না, যার বিধান বা অনুমোদন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে প্রদান করেননি। এ মূলনীতি বিদআত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিষেধাজ্ঞা থেকেই প্রমাণ হয়। বিদআতের সংজ্ঞাই হচ্ছে আল্লাহর অনুমোদন বিহীন ইবাদাত রচনা করা ও তার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার চেষ্টা করা। এজন্যেই হুযাইফা রাদিআল্লাহু আনহু- বলেছেন : “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব ইবাদাতের মাধ্যমে ইবাদাত করেননি, তোমরাও তার মাধ্যমে ইবাদাত কর না”।
এ প্রসঙ্গে ইমাম মালেক -রাহিমাহুল্লাহ- বলেছেন :
“সে যুগে যা দ্বীন বা ধর্ম ছিল না, এ যুগেও তা দ্বীন বলে গণ্য হবে না”। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে যা দ্বীন ছিল না, সে যুগে যার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদাত করা হয়নি, তার পরবর্তী যুগে তা দ্বীন ও ধর্মের অংশ হিসেবে গণ্য হবে না।
প্রশ্নকারীর উদাহরণ “জারহু ও তাদিল শাস্ত্র” এবং ইহা এক অনিন্দনীয় বিদআত :
মূলত যারা বিদআতকে দু’ভাগে ভাগ করে “বিদআতে হাসানা” ও “বিদআতে সায়্যেআহ” তারা এ অভিমত পেশ করেছে। তারা এর চেয়ে আগে বেড়ে শরী‘আতের বিধানের ন্যায় বিদআতকেও পাঁচভাগে ভাগ করেছে : (ওয়াজিব, ইস্তেহবাব, ইবাহাত, হারাম ও মাকরুহ)। এ ভাগ সর্বপ্রথম ইজ্জ ইবন আব্দুস সালাম উল্লেখ করেন, অতঃপর তার শিষ্য কুরাফি তার অনুরসণ করেন।
এ বণ্টনের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করায় শাতেবি -রাহিমাহুল্লাহ- কুরাফির প্রতিবাদ করে বলেন : “এ বণ্টন স্বরচিত, এর পক্ষে শরী‘আতের কোন দলিল নেই, বরং এ বণ্টন স্ব-যুক্তির বিচারেই বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত। কারণ বিদআতের সংজ্ঞা হচ্ছে, শরী‘আতের কোন দলিল যা প্রমাণ করে না তাই বিদআত, না সরাসরি কুরআন-না হাদিস, না তার থেকে নিঃসৃত কোন নীতি। যদি শরী‘আতের এমন দলিল থাকে, যার দ্বারা ওয়াজিব অথবা নুদুব অথবা ইবাহাত প্রমাণিত হয়, তাহলে এসব বিদআত থাকে না, বরং অন্যান্য আদিষ্ট আমলের অন্তর্ভুক্ত অথবা তার মধ্যে উত্তম আমল হিসেবে গণ্য হয়। অতএব এগুলোকে (ওয়াজিব, ইস্তেহবাব, ইবাহাত, হারাম ও মাকরুহ) বিদআত গণ্য করা এবং এগুলোর স্বপক্ষে ওয়াজিব অথবা নুদুব অথবা ইবাহাতের দলিল বিদ্যমান থাকার দাবি করা, মূলত দুই বিপরীত বস্তুকে একত্র করার শামিল।
হ্যাঁ, এ বণ্টনের অন্তর্ভুক্ত “মাকরুহ” ও “হারাম” বিদ‘আত হিসেবে সমর্থন যোগ্য অন্য বিবেচনায় নয়, অর্থাৎ বণ্টন হিসেবে বিদ‘আত বিবেচ্য নয়। কারণ নিষেধাজ্ঞার উপর অথবা মাকরুহ হওয়ার উপর যদি কোন দলিল থাকে, তখন সেটা বিদআত নয়, বরং তা পাপের অন্তর্ভুক্ত, যেমন হত্যা, চুরি, মদপান ইত্যাদি। অতএব কোন বিদআতের ক্ষেত্রেই এ বণ্টন কল্পনা করা যায় না, শুধু মাকরুহ ও হারাম ব্যতীত, যেমন বিদআতের আলোচনায় বলা হয়।
কুরাফি বিদআত প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে সাথীদের যে ঐক্য বর্ণনা করেছেন তা ঠিক, কিন্তু তিনি যে বিদআতের শ্রেণী ভাগ বর্ণনা করেছেন, এর ফলে তার উপর ঐক্য দাবি করা ঠিক নয়। আশ্চর্যের বিষয় ! মত বিরোধ সত্ত্বে এবং ঐক্য ভঙ্গের কারণ জানা থাকার পরও তিনি কিভাবে ঐক্য দাবি করলেন! হয়তো, বরং নিশ্চিত এ ব্যাপারে তিনি তার উস্তাদের অনুসরণ করেছেন কোন ভাবনা ছাড়াই।
অতঃপর তিনি (শাতেবি রহ.) এ বণ্টনের ব্যাপারে ইজ্জ ইবন আব্দুস সালামের কারণ বর্ণনা করেন। তিনি মূলত “মাসালেহে মুরসালাহ”-কে বিদ‘আত নামকরণ করেছেন। অতঃপর তিনি বলেন : কিন্তু কুরাফির তার শায়খের এ বণ্টন তার পছন্দের বিরুদ্ধে নকল করার কোন কারণ গ্রহণযোগ্য নয়, আর না অন্যের পছন্দ অনুযায়ী তা প্রকাশ করা। কারণ তিনি এ বণ্টনের মাধ্যমে ইজমা ও ঐক্যের খেলাফ করেছেন, তাই এ বণ্টন ইজমা ও উম্মতের ঐক্য মতের খেলাফ”। আল-ই‘তিসাম : (পৃষ্ঠা নং: ১৫২-১৫৩) পাঠকবর্গকে আমরা তার কিতাব দেখার অনুরোধ করছি, কারণ তিনি পরিপূর্ণ রূপে ও সুন্দরভাবে এর প্রতিবাদ করেছেন- রাহিমাহুল্লাহ-
ইজ্জ ইবন আব্দুস সালাম তার বিদআতের বণ্টন অনুসারে বলেন : ওয়াজিব বিদআতের অনেক উদাহরণ রয়েছে :
এক. আল্লাহর কালাম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস বুঝার জন্য ইলম নাহু বা আরবি ব্যাকরণ শাস্ত্র নিয়ে মশগুল হওয়া। শরী‘আত হিফাজত করার জন্য এ ইলম অর্জন করা ওয়াজিব। কারণ, এ ইলম ব্যতীত শরী‘আত হিফাজত করা সম্ভব নয়, আর যা ব্যতীত ওয়াজিব আদায় করা সম্ভব নয়, তা অর্জন করাও ওয়াজিব।
দুই. কুরআন ও হাদিসের শব্দ মুখস্থ করা।
তিন. উসূলে ফিকাহ আবিষ্কার করা।
চার. সহীহ ও দুর্বল হাদিস পার্থক্য করার জন্য “জরহু ও তাদিল শাস্ত্র” শিক্ষা করা। শরী‘আতের নীতিমালা দ্বারা প্রমাণিত যে, শরী‘আত সংরক্ষণ করা ফরয, যেহেতু এসব ইলম ব্যতীত শরী‘আত সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়, তাই এসব ইলম অর্জন করাও ফরয”। “কাওয়েদুল আহকাম ফি মাসালেহেল আনাম” : (২/১৭৩)
ইমাম শাতেবি এরও প্রতিবাদ করেছেন, তিনি বলেন : “আর ইজ্জুদ্দিনের কথা : ‘যা ব্যতীত ওয়াজিব আদায় হয় না, তা অর্জন করাও ওয়াজিব’। এসব ব্যাপারে পূর্বসূরিদের আমল থাকা জরুরী নয়, আর না নির্দিষ্টভাবে শরী‘আতের কোন দলিল এর পক্ষে থাকা জরুরী, কারণ এগুলো “মাসালেহে মুরসালাহ” এর অন্তর্ভুক্ত, বিদ‘আতের নয়।” আল-ইতিসাম : (পৃষ্ঠা নং: ১৫৭-১৫৮)
এ প্রতিবাদের সারসংক্ষেপ : এসব ইলমকে শরী‘আতের নিন্দনীয় বিদআত হিসেবে গণ্য করা ঠিক নয়, কারণ শরী‘আতের সাধারণ বিধান ও তার সাধারণ নীতি এসব ইলমের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে এবং এর গুরুত্বের সাক্ষী দেয়। অর্থাৎ শরী‘আতের যেসব দলিল দ্বীন ও সুন্নত হিফাজত করার নির্দেশ দেয় এবং শরী‘আতের জ্ঞান ও কুরআন-হাদিস যথাযথ মানুষের নিকট পৌঁছানোর তাগিদ প্রদান করে, তা এ জাতীয় ইলম অর্জনের প্রতিও উদ্বুদ্ধ করে।
আবার এও বলা যায় : এসব ইলম আভিধানিক অর্থে বিদআত, শরয়ী বিদআত নয়, শরয়ী সকল বিদআতই নিন্দনীয়। আর আভিধানিক বিদআতের কতক ভাল আর কতক মন্দ।
ইবন হাজার আসকালানি -রাহিমাহুল্লাহ- বলেছেন : শরী‘আতের দৃষ্টিতে সকল বিদআত নিন্দনীয়, কিন্তু আভিধানিক অর্থে নিন্দনীয় নয়, কারণ আভিধানিক অর্থে পূর্বের নমুনা ব্যতীত যে কোন আবিষ্কারই বিদআত, কি ভাল কি মন্দ। ফাতহুল বারি : (১৩/২৫৩)
তিনি আরও বলেন : “"البِدَع" শব্দ بدعة এর বহুবচন, পূর্বের নমুনাহীন প্রত্যেক আবিষ্কারই বিদআত, আভিধানিক অর্থে ভাল-মন্দ সব আবিষ্কার এর অন্তর্ভুক্ত, তবে শরয়ী পরিভাষায় শুধু মন্দকেই বিদআত বলা হয়, যদি শরী‘আত অনুমোদিত কোন বিষয়ে কখনো বিদআত ব্যবহার হয়, তাহলে সেটা তার আভিধানিক অর্থে”। ফাতহুল বারি : (১৩/৩৪০)
ফাতহুল বারির (৭২৭৭) নং হাদিসের টিকায় রয়েছে, শায়খ আব্দুর রহমান আল-বারাক -হাফিজাহুল্লাহ- বলেছেন : “এ বণ্টন হচ্ছে আভিধানিক অর্থে, কিন্তু শরয়ী অর্থে সকল বিদআত গোমরাহী, যেরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
"وشر الأمور محدثاتها ، وكل بدعة ضلالة". صحيح مسلم : (1441)
“আর সবচেয়ে খারাপ বস্তু হচ্ছে বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআত গোমরাহী”। [সহীহ মুসলিম: ১৪৪১]
বিদআত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন সাধারণ মন্তব্য থাকা সত্ত্বেও বিদআতকে ভাগ করে, ওয়াজিব অথবা মুস্তাহাব অথবা মুবাহ বলা দুরস্ত নয়, বরং শরী‘আতের মধ্যে প্রত্যেক বিদ‘আতই হারাম অথবা মাকরুহ। এ মাকরুহ বিদআতের উদাহরণ যেমন ফজর ও আসরের সময়ে নির্দিষ্টভাবে মুসাফাহ করা, অনেকে বলে এটা মুবাহ তথা বৈধ বিদআত।
আরও একটি বিষয় বিবেচনা যোগ্য : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে কোন বাঁধা না থাকা এবং সকল আয়োজন বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও মীলাদুন্নবী উদযাপন না করা। মীলাদুন্নবী ও নবীর মহব্বত উভয় সাহাবাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল, যার ভিত্তিতে তারা ইচ্ছা করলে মীলাদুন্নবী উদযাপন করতে পারতেন, এতে কোন বাঁধাও ছিল না, এ সত্ত্বেও যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবায়ে কেরাম মীলাদুন্নবী উদযাপন করেননি, তাই এটা অবৈধ, যদি বৈধ হতো তাহলে তারা সকলের আগেই এ অনুষ্ঠান পালন করতেন।
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ -রাহিমাহুল্লাহ- বলেছেন : “অনুরূপ কতক লোকের (মীলাদুন্নবী) আবিষ্কার, তারা হয়তো নাসারাদের অনুকরণে, যেমন তারা ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মানুষ্ঠান পালন করে, অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বত ও সম্মানের খাতিরে, আল্লাহ তাদের এ মহব্বত ও সম্মানের প্রতি সাওয়াব দিতেও পারেন, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিনকে ঈদ হিসেবে পালন করার জন্য নয়, অধিকন্তু তার জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে দ্বিমত তো রয়েছেই। কারণ আমাদের পূর্বসূরি ও আদর্শ মনীষী কেউ এটা পালন করেননি, অথচ তখনো এর দাবি বিদ্যমান ছিল, কোন বাঁধা ছিল না, যদি এটা কল্যাণকর হতো অথবা ভাল হতো, তাহলে আমাদের পূর্বসূরিগণই এর বেশী হকদার ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বত আমাদের চেয়ে তাদের মধ্যে বেশী ছিল। তারা তাকে আমাদের চেয়ে অধিক সম্মান করতেন। আমাদের চেয়ে তারা কল্যাণের ব্যাপারে অগ্রগামী ছিলেন। বস্তুত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিপূর্ণ মহব্বত ও সম্মানের পরিচয় হচ্ছে, তার আনুগত্য ও অনুসরণ করা, তার নির্দেশ পালন করা এবং প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে তার সুন্নত জীবিত করা, তার আনিত দ্বীন প্রচার করা এবং এ জন্য অন্তর-হাত ও মুখ দ্বারা জিহাদ করা, কারণ এটাই আমাদের পূর্বসূরি মুহাজির, আনসার ও তাদের যথাযথ অনুসারীদের নীতি ও আদর্শ ছিল”। ইকতেদাউস সিরাত : (পৃষ্ঠা: ২৯৪-২৯৫)
এটা সরল ও সাধারণ কথা : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত অনুসরণের মধ্যেই তার প্রতি মহব্বত প্রকাশ পায়। আরও প্রকাশ পায় তার সুন্নতের শিক্ষা বিস্তার ও প্রসার করা এবং তার সুন্নতের উপর থেকে যে কোন হামলা প্রতিরোধ করা ইত্যাদিতে। মূলত এটাই ছিল সাহাবাদের পদ্ধতি।
কিন্তু পরবর্তী যুগের লোকেরা নিজেদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে এবং এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শয়তানও তাদের ধোঁকা দিচ্ছে। তাদের ধারণা এসবের মাধ্যমে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বত প্রকাশ করছে, কিন্তু তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত জীবিত করা, তার অনুসরণ করা, তার দিকে দাওয়াত দেয়া ও মানুষকে তা শিক্ষা দেয়া এবং তার উপর থেকে হামলা প্রতিহত করা থেকে অনেক দূরে।
তৃতীয়ত : এ ব্যক্তি যে বলেছে ইবন কাসির -রাহিমাহুল্লাহ- মীলাদুন্নবী বৈধ বলেছেন, আমাদের সামনে সে এর দলিল পেশ করুক, কারণ আমরা তার এ ধরণের বক্তব্য সম্পর্কে জানি না, আমরা মনে করি তিনি এ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আল্লাহ ভাল জানেন।
সমাপ্ত
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2জনৈক খৃস্টান নারীর জিজ্ঞাসা মীলাদুন্নবী কী, মুসলিমের নিকট এ দিনের গুরুত্ব কত?
প্রশ্ন : নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে দিন জন্ম গ্রহণ করেছেন, তার গুরুত্ব কী, কখন ও কিভাবে তা পালন করতে হয় ?
উত্তর :
আল-হামদুলিল্লাহ
প্রথমত : মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষের নিকট আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, তার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা মানুষদেরকে অন্ধকার থেকে আলোয় বের করেছেন। তিনি মানুষদের হাত ধরে গোমরাহী থেকে হিদায়াত ও সঠিক পথে নিয়ে এসেছেন।
আশা করছি এ প্রশ্ন ইসলাম সম্পর্কে আপনার গবেষণা ও অনুসন্ধানের প্রথম স্তর এবং এ সম্পর্কে জানা ও পড়া-শোনার প্রথম ধাপ। আপনি কুরআনের অনুবাদ পড়ার চেষ্টা করুন, তাহলে এ দ্বীন সম্পর্কে আরও অধিক জানতে পারবেন। সন্দেহ নেই আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করে আমাদের দ্বীনি বোন হয়ে যান, তাহলে আমরা অধিক খুশি হবো।
দ্বিতীয়ত : ইসলাম ধর্মে ইবাদাত কিছু মূলনীতির উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত আল্লাহ তা‘আলার নীতি ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনিত আদর্শের অনুসরণ ব্যতীত কারো ইবাদাত গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহর নির্দেশিত ইবাদাত ব্যতীত অন্য পন্থায় যে ইবাদাত করবে, আল্লাহ তার ইবাদাত কবুল করবেন না। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। আয়েশা -রাদিআল্লাহু- আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
( مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ ) رواه البخاري ( كتاب الصلح / 2499)
“আমাদের এ দ্বীনে যে নতুন আবিষ্কার করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যক্ত”। [বুখারী : ২৪৯৯]
ঈদ এসব ইবাদাতেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জন্য দু’টি ঈদের অনুমোদন দিয়েছেন, এ ছাড়া আর কোন ঈদ উদযাপন করা বৈধ নয়।
ঈদে মীলাদুন্নবী সম্পর্কে জানা প্রয়োজন যে, এ দিনে ঈদ উদযাপন করার অনুমতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে দেননি। তিনি নিজে এ দিনে ঈদ উদযাপন করেননি, অনুরূপ তার সাহাবাগণও নয়। অথচ আমাদের চেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাদের মহব্বত অধিক ছিল। এ জন্য এ দিনে আমরা ঈদ উদযাপন করব না। এতেই রয়েছে আল্লাহ ও তার রাসূলের অনুসরণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
( وَمَا ءَاتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا ) سورة الحشر/7 ،
“রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও”। সূরা হাশর : (৭)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :( علَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلالَة ) رواه أبو داود ( السنة/3991 ) ، وصححه الألباني في " صحيح أبي داود " برقم (3851) .
“তোমরা আমার সুন্নত ও আমার খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নত আঁকড়ে থাক এবং মাড়ির দাঁত দিয়ে তা কামড়ে ধর। খবরদার ! তোমরা নতুন আবিষ্কৃত বস্তু থেকে দূরে থাক, কারণ প্রত্যেক নতুন আবিষ্কৃত বস্তু বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআত গোমরাহী”। [আবু দাউদ : ৩৯৯১], আল-বানি সহীহ আবু দাউদে : (৩৮৫১) হাদিসটি সহীহ বলেছেন।
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বত যেসব জিনিস দ্বারা প্রকাশ পায়, তা হচ্ছে তার প্রতিটি আদেশ ও নিষেধ মেনে চলা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম দিন বা মীলাদুন্নবী উদযাপন করা তার নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত।
আর যে ব্যক্তি ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন করতে চায়, তার উচিত এর স্বপক্ষে দলিল পেশ করা, তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম দিন সোমবার সিয়াম সাধনার ফজিলত রয়েছে, কিন্তু এটা শুধু ঈদে মীলাদুন্নবীর সোমবার নয়, বরং বছরের প্রতিটি সোমবার এ ফজিলতের অন্তর্ভুক্ত। আবু কাতাদা আনসারী রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবারে সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেন : “এ দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনে আমার উপর অহী নাযিল করা হয়েছে”। মুসলিম : (১৯৭৮) সোমবার দিন বান্দার আমল আসমানে উঠানো হয় এবং তা আল্লাহর নিকট পেশ করা হয়।
মুদ্দাকথা : ঈদে মীলাদুন্নবীর অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি আল্লাহ তা‘আলা বা তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদান করেননি, তাই আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশ অনুসারে এ দিনে ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করা বৈধ নয়। দোয়া করছি, আল্লাহ আপনাকে সঠিক পথের সন্ধান দান করুন। আল্লাহ ভাল জানেন।
সমাপ্ত
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2মীলাদুন্নবী উপলক্ষে মিলিয়ন মিলিয়ন দরূদ জমা করার বিদআত প্রসঙ্গ
প্রশ্ন :
মীলাদুন্নবী উপলক্ষে নিম্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিলিয়ন মিলিয়ন দরূদ জমা করার বিধান জানতে চাই। প্রত্যেক ব্যক্তি তার পরিচিতদের নিকট নির্দিষ্ট সংখ্যক দরূদ ভাগ করে দেয়, অতঃপর তার পরিচিত, বন্ধু-বান্ধব ও নিজ পরিবারের দরূদ পাঠের সংখ্যা জমা করে। উদাহরণত : কোন এক ছাত্র গ্রামে গিয়ে প্রত্যেক বাড়ির দরোজা নক করে তাদের পরিবার কাছে ১০০০ (এক হাজার) অথবা তার চেয়ে অধিক সংখ্যক দরূদ পাঠের অনুরোধ করে, আর বলে আপনাদের সংখ্যা জানার জন্য এক সপ্তাহ পর আমি আবার আসছি। তাদের কেউ এক হাজার পুরো করে, কেউ অধিক পড়ে। এভাবে মিলিয়ন, আধা মিলিয়ন দরূদ জমা করে। আবার মাদরাসার ছাত্রদের প্রত্যেককে ৫০০ (পাঁচশত) বার দরূদ পড়ার দায়িত্ব দেয়া হয়। এভাবে তিন মিলিয়ন দরূদ জমা করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে যোগদান করার বিধান কী ? এভাবে দরূদ জমা করার বিধান কী ? সংক্ষেপে উত্তর আশা করছি, আল্লাহ আপনাদের তাওফিক বৃদ্ধি করুন।
উত্তর : আল-হামদুলিল্লাহ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত ও আদর্শ সম্পর্কে যার জ্ঞান রয়েছে, কুরআন ও হাদিসের জ্ঞানে যে আলোকিত, ইসলামের ছায়ায় অবস্থান করার যে সুযোগ লাভ করেছে, শরী‘আত ও ইবাদাতের স্বাদ যে আস্বাদন করেছে, তার অবশ্যই জানার কথা যে, প্রশ্নে উল্লেখিত এসব কর্ম বিদআত ও গোমরাহী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বতের দাবিদার কোন মুসলমানের পক্ষে থেকে এসব কর্ম সম্পাদিত হতে পারে না। অন্যথায় আবু বকর ও সাহাবায়ে কেরাম কোথায় ছিলেন ? সাঈদ ইবন মুসাইয়্যেব ও অন্যান্য তাবেঈগণ কোথায় ছিলেন ? চার ইমাম ও ইসলামের অন্যান্য ইমামগণ কোথায় ছিলেন ? তারা কেন এমন করেননি। তাদের কারো থেকেই তো এ ধরণে কর্মের কোন প্রমাণ নেই, বরং এর সাদৃশ্য কোন আমলেরও নয়।
হ্যাঁ, আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন, খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আমাদেরকে এ জন্য উৎসাহ প্রদান করেছেন, কিন্তু তাকে সত্যিকার মহব্বতকারী ও সাওয়াবের জন্য অতি আগ্রহী কেউ তো এরূপ আমল বা এর সাদৃশ্য কোন আমল করেননি ?!
রুটিন তৈরিতে সময় অপচয় এবং মাদরাসা মাদরাসা, ঘরে ঘরে ও মজলিসে মজলিসে এসব বিতরণ করায় কোন ফায়দা নেই, উল্টো সময় নষ্ট, বরং পথভ্রষ্টতা ও বিবেকহীন কর্ম ব্যতীত কিছুই নয় !
তারা যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করার অর্থ জানত, তাহলে উপকারী কোন বস্তুর জন্য এ শ্রম ব্যয় করার উদ্যোগ গ্রহণ করত, যেমন স্ত্রীদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ শিক্ষা দেয়া, ওযুর পদ্ধতি শিক্ষা দেয়া, সালাতের পদ্ধতি শিক্ষা দেয়া ইত্যাদি। তারা মানুষকে সুদ পরিহার করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করত, জামাতের জন্য উদ্বুদ্ধ করত, বরং যারা সালাত আদায় করে না, তাদেরকে সালাত আদায়ে আগ্রহী করত, নারীদেরকে উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনা থেকে সতর্ক করত ইত্যাদি। এর ফলে অনেক সম্প্রদায় ও দলের নিকট রিসালাতের বাণী পৌঁছত, যারা হিদায়াত ভুলে গেছে, সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। কিন্তু বিদআতিরা এসব মহান আমলের তাওফিক কিভাবে লাভ করবে, বরং তারা তো রাসূলের সত্যিকার আনুগত্যকে উপহাসের দৃষ্টিতে দেখে, শরয়ী ও বৈধ মহ্বতকে মূর্খতার দৃষ্টিতে দেখে ?!
এসব লোকেরা বিভিন্ন বিদআতে মগ্ন হয়েছে, অথবা একই বিদআতে বিভিন্ন পদ্ধতিতে লিপ্ত হয়েছে, যেমন :
১. তারা ঈদে ! মীলাদুন্নবী উপলক্ষে এ দরূদের আয়োজন করছে, এ উপলক্ষ বিদআত।
২. নির্দিষ্ট সংখ্যক দরূদ নির্ধারণ করা এবং নিজেদের পাঠ করা ও অন্যদের পাঠ করা দরূদের সংখ্যা জমা করার নির্দেশ আল্লাহ প্রদান করেননি। হাদিসে এসেছে “মুসলিম দশবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পড়বে, এর অতিরিক্ত যা হবে, সেটা তার জন্যই”। যদিও এ হাদিসের বিশুদ্ধতা প্রশ্ন বিদ্ধ। কারো অধিকার নেই নির্দিষ্ট সংখ্যার কোন যিকর অনির্দিষ্ট করে দেয়া, অনুরূপ অনির্দিষ্ট কোন যিকরের নির্দিষ্ট সংখ্যা বর্ণনা করা।
এসব বিদআতিদের জন্য ইবন মাসউদের বাণীই যথোপযুক্ত, তিনি তাদেরই পূর্বসূরি একদল বিদআতিকে দেখে বলেছিলেন : “তোমরা তোমাদের পাপগুলো গণনা কর, তোমাদের কোন নেকি বরবাদ হবে না, আমি এর জিম্মাদার”। দারামি তার সুনানের : (২০৪) ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন। তার উদ্দেশ্য, এসব কর্মে তোমাদের সময় অপচয় হচ্ছে এবং বিদআতে মগ্নতার কারণে তোমাদের গুনা হচ্ছে, এর চেয়ে যদি তোমরা তোমাদের পাপগুলো গণনা কর, তাহলে তোমাদের পাপ হবে না আমি নিশ্চিত।
৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করা সম্মিলিত ও সাধারণ ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং এটা বান্দা ও রবের মধ্যবর্তী বিশেষ এক ইবাদাত। ইবনুল কাইয়ূম -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ যদিও উত্তম আমল এবং আল্লাহর নিকট খুব প্রিয়, তবুও প্রত্যেক যিকরের নির্দিষ্ট সময় আছে, সে জায়গায় অন্য যিকর শুদ্ধ নয়। আলেমগণ বলেছেন : এ জন্যই রুকু, সেজদা ও রুকু থেকে দাঁড়ানো অবস্থায় দরূদ পাঠ করা বৈধ নয়। “জালাউল আফহাম ফি ফাদলিস সালাতাআলা মুহাম্মদ খায়রিল আনাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” : (১/৪২৪)
এসব বিদআতে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব এ থেকে তাওবা করা এবং মানুষদেরকে এর প্রতি আহ্বান করা থেকে বিরত থাকা। এসব বিদআত সম্পর্কে অবগত ব্যক্তির কর্তব্য : লোকদেরকে এতে শরিক হতে বারণ করা, অথবা তার দিকে আহ্বান করা থেকে বিরত রাখা ও বিদআতিদের কথায় ধোঁকায় পতিত না হওয়া।
বিবেকবান কোন ব্যক্তিই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরূদ থেকে নিষেধ করতে পারে না, যার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তা‘আলা এবং যার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কিন্তু এসব বিদআতি পদ্ধতিতে এ যিকর বা অন্য কোন যিকর দ্বারা কখনোই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব নয়।
আশা করছি আমাদের এ উত্তরই যথেষ্ট, অতএব এখন প্রয়োজন গভীর মনোযোগ ও দৃঢ় চিত্তে তা অধ্যয়ন করা। দোয়া করছি আল্লাহ তা‘আলা আপনাদের উপকৃত করুন এবং গোমরাহ মুসলিমদেরকে তাদের নবীর সুন্নত অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহ ভাল জানেন।
সমাপ্ত
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2মীলাদুন্নবী নামে মসজিদে সমবেত হয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোচনা করা
প্রশ্ন :
আমাদের সবার নিকট পরিচিত মীলাদুন্নবী বিদআত, কিন্তু অনেকেই মীলাদুন্নবী নামে অনুষ্ঠান করে নবীর জন্মানুষ্ঠান পালন করার জন্য নয়, বরং নবীর জীবন চরিত ও আনুষঙ্গিক বিষয় আলোচনার জন্য, নবীর জন্ম দিন ও তারিখ মোতাবেক না হলে এ অনুষ্ঠান কি হারাম ? মীলাদ নামকরণই কি এ অনুষ্ঠান হারাম হওয়ার কারণ ? অথবা মীলাদ শব্দ বা পরিভাষা পরিহার করে নবীর জীবন চরিত আলোচনার অনুষ্ঠান কি হারাম ? উল্লেখ্য এ অনুষ্ঠানে লোকদের খানা পরিবেশন করা হবে। আমার জিজ্ঞাসার কারণ আগামী সপ্তাহের শেষে রবিবার ছুটির দিনে নতুন দুলহানদের উপলক্ষে নৈশ ভোজের আয়োজন করা হয়েছে, সেখানে যেহেতু লোকের সমাগম হবে, তাই এর আয়োজকরা নৈশ ভোজের পর মসজিদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চরিত আলোচনার ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু তার নামকরণ করেছে মীলাদ, তবে এ দিন নবীর জন্ম দিনের মোতাবেক নয়, নবীর জন্মদিন উপলক্ষে এ অনুষ্ঠান করা হচ্ছে না, তবে নবীর জীবন চরিত আলোচনা করা হবে, এ আলোচনা মূলত নাচ-গানের পরিবর্তে, যেন লোকেরা নবীর জীবন চরিত শোনে অধিকতর উপকৃত হয়, আমি আপনাদের সৎ উপদেশ কামনা করছি। দ্বিতীয়ত : নবীর জীবন চরিত ও খাদ্য পরিবেশন করার জন্য মসজিদে অনুষ্ঠান আয়োজন করা কি হারাম ?
উত্তর :
আল-হামদুলিল্লাহ
কোন মানুষের জন্মানুষ্ঠান পালন করা বা মীলাদ অনুষ্ঠান বৈধ নয়, না কোন নবীর না কোন মনীষীর ? কারণ শরী‘আতে এর কোন ভিত্তি নেই, বরং এসব অনুষ্ঠান অমুসলিম তথা ইহুদী, নাসারা ও অন্যান্য জাতি-ধর্মের লোকদের থেকে আমদানি করা।
ঈদে মীলাদ অর্থ : কোন ব্যক্তির জন্মদিন উদযাপন করা, যেমন কতক লোকের ধারণানুযায়ী ১২ রবিউল আউয়াল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মানুষ্ঠান উদযাপন করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চরিত, চারিত্রিক গুণাবলি ও সুন্নতের আলোচনা সব সময়ই মুস্তাহাব। এ অনুষ্ঠানকে মীলাদ বলা হয় না, যেমন বিয়ের অনুষ্ঠানকে বলা হয় না মীলাদ, কিন্তু কতক মুসলিম দেশে সকল বৈধ অনুষ্ঠানকেই মীলাদ বলে, যেখানে নাচ-গান ও নারী-পুরুষের মেলামেশা নেই। তারা বলে : আমরা বিয়ের দিন মীলাদের আয়োজন করব অথবা খৎনার দিন মীলাদের আয়োজন করব, সেখানে কাউকে বয়ানের জন্য, কাউকে কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদির জন্য আহ্বান করা হয়, এ নামকরণের কোন ভিত্তি নেই, এ কারণে অনুষ্ঠান প্রশ্ন বিদ্ধ বা অবৈধ হবে না। তাই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপদেশ-নসিহতের আয়োজন করা, অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চরিত, তার সিরাত ও চারিত্রিক গুণাবলি আলোচনা করা বৈধ, এসব অনুষ্ঠান অবৈধ ও বিদ‘আতী মীলাদ মাহফিলের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
মসজিদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চরিতের সভা বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা বৈধ, তবে ফজিলত মনে করে এ জন্য কোন দিন নির্দিষ্ট করা বৈধ নয়, যেমন মীলাদুন্নবীর দিন অথবা শাবানের পনের তারিখের দিন অথবা ইসরা ও মেরাজের দিন, বরং বছরের যে কোন সময় এসব অনুষ্ঠান উদযাপন করা, এসব অনুষ্ঠানে খানা পরিবেশন করা বৈধ, তবে এ কথা প্রচার করা শ্রেয় যে, এ অনুষ্ঠানের নাম মীলাদ মাহফিল নয়, যেন কারো অন্তরে মীলাদ মাহফিল বৈধ এ ধারণা না জন্মায়। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি, তিনি আপনাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের উপর আমল ও তা প্রচার করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহ ভাল জানেন।
সমাপ্ত
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2মীলাদুন্নবী উদযাপন এবং এতে অংশগ্রহণ না করার কারণে পরিবারের যারা তিরস্কার করে, তাদের সাথে আচরণ করার পদ্ধতি
প্রশ্ন : আমি মীলাদুন্নবী উদযাপন করি না, পরিবারের অন্যান্য সদস্য তা উদযাপন করে, তারা বলে : আমার ইসলাম নতুন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মহব্বত করি না, এ বিষয়ে আমার জন্য কোন উপদেশ আছে কি ?
উত্তর : আল-হামদুলিল্লাহ
প্রথমত :
প্রিয় ভাই, মীলাদুন্নবী ত্যাগ করে তুমি খুব ভাল কাজ করেছ, এটা মানুষের নিকট বহুল প্রচলিত একটি বিদআত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করার কারণে যারা তোমাকে অপবাদ দেয়, ইসলামের আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে যারা তোমাকে তিরস্কার করে, তাদের প্রতি তুমি ভ্রুক্ষেপ কর না। আল্লাহ তা‘আলা এমন কোন রাসূল প্রেরণ করেননি তার কওমের নিকট, যার সাথে তার কওম উপহাস করেনি, যারা তার বিবেক ও দ্বীনের উপর অপবাদ আরোপ করেনি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
كَذَلِكَ مَا أَتَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا قَالُوا سَاحِرٌ أَوْ مَجْنُونٌ
"এভাবে তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে যে রাসূলই এসেছে, তারা বলেছে, 'এ তো একজন যাদুকর অথবা উন্মাদ'।" সূরা যারিয়াত : (৫২) এসব নবী-রাসূলগণ তোমার আদর্শ, তাদের সুন্নত পালন করার তোমার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তোমাকে যে কষ্ট স্পর্শ করে তার জন্য তুমি ধৈর্য ধারণ কর, আর তোমার রবের নিকট তার সাওয়াবের আশা কর।
দ্বিতীয়ত :
তোমার জন্য উপদেশ : তাদের সাথে ঝগড়া ও বাদানুবাদ থেকে তুমি বিরত থাক, হ্যাঁ যদি তাদের মধ্যে কাউকে বুদ্ধিমান দেখ, যে শ্রবণ করবে ও উপকৃত হবে, তাহলে তাদেরকে তুমি বাছাই কর এবং মীলাদুন্নবীর বাস্তবতা, হুকুম ও মীলাদুন্নবীর সাথে সাংঘর্ষিক দলিল সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত কর। তাদের নিকট তুমি ইত্তেবার ফজিলত ও বিদআতের অনিষ্ট বর্ণনা কর। এদের সাথে তোমার আলোচনা ও এদেরকে তোমার উপদেশ প্রদান ফলপ্রসূ হবে, ইনশাআল্লাহ।
১. তারা যেখানে শেষ করে, আমরা সেখান থেকেই আরম্ভ করব। যেমন তারা তোমাকে বলেছে : "তোমার ইসলাম নতুন"। আমরা বলব : কে পুরনো (আসল) দ্বীন ও ইসলামের অনুসরণ করে : মীলাদুন্নবী পালনকারী, না মীলাদুন্নবী ত্যাগকারী ? বিবেকী ও ইনসাফ পন্থী প্রত্যেকের নিকট এর সঠিক উত্তর একটি : মীলাদুন্নবী ত্যাগকারীই আসল ও পুরনো দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত। সাহাবায়ে কেরাম, তাদের অনুসারী তাবেঈ ও তাবেঈদের অনুসারী এবং তাদের পরে মিসরের উবাইদি যুগের আগ পর্যন্ত কেউ এ মীলাদুন্নবী পালন করেনি। এ ঈদের প্রচলন হয়েছে তাদের থেকে, অতএব কে নতুন ইসলামের অনুসারী ?!
২. আমরা দেখব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অধিক মহব্বতকারী কারা : সাহাবায়ে কেরাম, না তাদের পরবর্তী লোকজন ? একজন বিবেকী ও ইনসাফ পূর্ণ ব্যক্তির নিকট অবশ্যই এর সঠিক উত্তর, সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অধিক মহব্বতকারী। তারা মীলাদুন্নবী পালন করেছে, না ত্যাগ করেছে ?! অতএব এরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বতের ময়দানে কিভাবে তাদের প্রতিযোগী বা সমকক্ষ হিসেবে গণ্য হবে ?!
৩. আমরা জিজ্ঞাসা করব : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বতের অর্থ কী ? প্রত্যেক বিবেকী ও বুদ্ধিমানের নিকট এর উত্তর : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসরণ ও তার পথে চলা। এসব মীলাদুন্নবী পালনকারীরা যদি তাদের নবীর আদর্শ আঁকড়ে ধরত এবং তাকে অনুসরণ করার পথ বেছে নিত, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মহব্বতকারী ও তার আনুগত্যকারী সাহাবায়ে কেরামের জন্য যা যথেষ্ট ছিল, এদের জন্যও তাই যথেষ্ট হতো। তারা অবশ্যই জানত যে, পূর্ববর্তী লোকদের অনুসরণের মধ্যেই সকল কল্যাণ, আর পরবর্তী লোকদের অনুসরণে রয়েছে সকল অকল্যাণ।
কাদি আয়াদ -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বতের আলামত অধ্যায়ে :
"জেনে রেখ, যে ব্যক্তি কোন জিনিসকে মহব্বত করে, সে তাকে প্রাধান্য দেয় এবং তার অনুসরণকে অগ্রাধিকার দেয়, অন্যথায় তার মহব্বত সঠিক নয়, সে শুধু দাবিদার। অতএব সে ব্যক্তিই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যিকার মহব্বতের ধারক, যার উপর মহব্বতের নিদর্শন প্রকাশ পায়। যার মধ্যে প্রধান হচ্ছে : তার অনুসরণ করা, তার সুন্নত পালন করা, তার কথা ও কর্ম মেনে চলা, তার নির্দেশ বাস্তবায়ন করা, তার নিষেধ থেকে বিরত থাকা এবং স্বচ্ছলতা-অস্বচ্ছলতা, চঞ্চলতা-স্থবিরতা সব ক্ষেত্রেই তার আদব ও শিষ্টাচার অনুশীলন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
'বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন।' সূরা আলে-ইমরান : (৩১) আর তার বিধানকে প্রাধান্য দেয়া, তার আনুগত্যকে রিপু ও প্রবৃত্তির আনুগত্যের উপর অগ্রাধিকার দেয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
وَالَّذِينَ تَبَوَّأُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
'আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদিনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদেরকে ভালবাসে। আর মুহাজিরদেরকে যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোন ঈর্ষা অনুভব করে না। এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়।' সূরা হাশর : (৯) আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য বান্দার অসন্তুষ্ট পরোয়া না করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
অতএব যার মধ্যে এসব গুণাগুণ বিদ্যমান সেই আল্লাহ ও তার রাসূলকে প্রকৃত পক্ষে মহব্বত করে, আর যার মধ্যে এসব গুণ পুরোপুরি বিদ্যমান নেই, তার মহব্বত অসম্পূর্ণ, যদিও সে এ মহব্বত থেকে একেবারে বাদ যাবে না।" "আশ-শিফা বি তারিফি হুকুল মুস্তাফা" : (২/২৪-২৫)
৪. আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম তারিখ দেখব, এর নির্দিষ্ট তারিখ জানার চেষ্টা করব, আদৌ কেউ তা নির্দিষ্ট করতে পেরেছে ? অতঃপর দেখব তার মৃত্যু তারিখ, তা নির্দিষ্ট না-অনির্দিষ্ট ?
নিশ্চয় প্রত্যেক বিবেকী ও ইনসাফ পূর্ণ লোকের নিকট এর সঠিক উত্তর এই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্ম তারিখ নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি, পক্ষান্তরে তার মৃত্যু তারিখ নির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত।
আমরা যদি সিরাতের বিভিন্ন গ্রন্থ দেখি, তাহলে জানতে পারি যে, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম তারিখ সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত পেশ করেছেন, যেমন :
১. রবিউল আউয়াল মাসের দ্বিতীয় তারিখ সোমবার।
২. রবিউল আউয়াল মাসের আট তারিখ।
৩. রবিউল আউয়াল মাসের দশ তারিখ।
৪. রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ।
৫. জুবায়ের ইবন বাক্কার বলেছেন : তিনি জন্ম গ্রহণ করেছেন রমযানে।
যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের সাথে দ্বীনি কোন বিষয় জড়িত থাকত, তাহলে অবশ্যই সাহাবায়ে কেরাম এর নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন, অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এর নির্দিষ্ট তারিখ জানিয়ে দিতেন, কিন্তু এর কিছুই হয়নি।
পক্ষান্তরে তার মৃত্যু : এ ব্যাপারে সকলে একমত যে, তিনি এগারো হিজরির বারো রবিউল আউয়াল সোমবার মারা যান।
বেদ্বীনএরপর দেখব এ বিদআতিরা কখন মীলাদুন্নবী পালন করে ? নিশ্চয় তারা তার মৃত্যু তারিখে মীলাদুন্নবী পালন করে, জন্মের তারিখে নয় ! উবাইদিরা এর উপরই অটল ছিল, যারা নিজেদের বংশ পরিবর্তন করে নাম রেখেছিল "ফাতেমি", ফাতেমা -রাদিআল্লাহু আনহা-র সাথে সম্পৃক্ত করে। তারা নিজেদের দাবি অনুসারে বাতেনি হিসেবে পরিচিত ছিল। তারা এ তারিখটি খুব আনন্দের সাথে গ্রহণ করে, তারা ছিল বেদ্বীন ও মুরতাদ, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু দিবসে আনন্দ করার মানসে এ উৎসব রচনা করে। তারা এতে বিভিন্ন মাহফিলের আয়োজন করে নিজেদের আনন্দ প্রকাশ করে। এর আড়ালে তারা কতক সরল মুসলমানকে ধোঁকা দিতে সক্ষম হয়, তারা বলে এসব অনুষ্ঠানে যারা তাদের অনুসরণ করবে, তারা প্রকৃত পক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মহব্বত করে। এভাবেই তারা তাদের দুষ্কর্ম ও ষড়যন্ত্রে সফলতা লাভ করে। তারা আরও কৃতকার্য হয় মহব্বতের অর্থ বিকৃত করার ক্ষেত্রে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বত তারা মীলাদুন্নবীর কবিতা আবৃতি, রুটি ও মিষ্টি বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, এতে তারা নাচ-গানের ব্যবস্থা করে, নারী-পুরুষের সংমিশ্রণ ঘটায়, বাদ্যযন্ত্র, বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা তো রয়েছেই, উপরন্তু এসব মজলিসে বিদআতি ওসিলা এবং শিরকি কালিমা পাঠ ও আবৃত্তি করা হয়।
তৃতীয়ত : প্রশ্নকারী ভাই, তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের উপর ধৈর্যধারণ কর, বিরোধীদের সংখ্যাধিক্যের কারণে ধোঁকায় পতিত হয়ো না, তোমাকে ইলম অর্জন করার উপদেশ দিচ্ছি এবং মানুষের উপকারী বস্তুতে আত্মনিয়োগ করার পরামর্শ দিচ্ছি। এ কারণে তুমি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না, তারা অন্যদের অনুসরণ করে, যারা মীলাদুন্নবীর বৈধতার ফতোয়া দেয়, বরং এটাকে মুস্তাহাব বলে ! তুমি নম্র-ভাবে তাদের প্রতিবাদ কর এবং সুন্দর কথা-কর্ম ও আদর্শ প্রকাশ কর, আর তাদেরকে তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের প্রভাব দেখাও তোমার চরিত্র ও ইবাদাতের মধ্যে। আল্লাহর নিকট তোমার জন্য তাওফিক প্রার্থনা করছি। আর আল্লাহ্ই ভাল জানেন।
সমাপ্ত
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2মীলাদুন্নবীতে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির নিকট মেয়ে বিয়ে দেয়ার বিধান
প্রশ্ন :
আমার একটি কঠিন প্রশ্ন, আমার শ্যালিকা ইদানীং বিয়ে করবে, কিন্তু সম্ভাব্য বরের প্রকৃতি সম্পর্কে সে শঙ্কিত। আমি স্পষ্ট করেই বলছি, সে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে : মীলাদকে কঠিনভাবে সমর্থনকারী অথবা মীলাদুন্নবীর মাহফিল আয়োজনকারী ব্যক্তির সাথে বিয়ে কি বৈধ ? আমি জানি যে, ইসলামে এ কাজটি বিদ‘আত। কিন্তু আমার সন্দেহ, মীলাদুন্নবী উদযাপনকারী ব্যক্তির সাথে একজন মুসলিম নারীর বিয়ে কিভাবে হতে পারে ! কারণ যেসব শহরে এ মীলাদ পালন করা হয়, তারা এটাকে ইবাদাতের ন্যায়ই পালন করে। এখানে লোকদের আহ্বান করা হয়, কতক হাদিস পড়ে শোনানো হয়, গান-বাজনা হয় এবং প্রার্থনা করা হয়। লোকেরা মূলত দেখে ও গান গায় ! আমার প্রশ্ন হচ্ছে এসব কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তির সাথে মুসলিম নারীর বিয়ে কি বৈধ ? এর চেয়েও কঠিন প্রশ্ন- আমি যা প্রকাশ করতেও সঙ্কোচ বোধ করছি— এ বিদ‘আতি কি মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে ?
উত্তর :
আল-হামদুলিল্লাহ
ঈদে মীলাদুন্নবী বা এ জাতীয় বিদআতি কাজ যারা করে, তাদের আমল ও কর্মকাণ্ডের ভিন্নতার ন্যায় তাদের হুকুমও ভিন্ন, যদিও মীলাদুন্নবী বিদআত। এ ধরণের মীলাদ আয়োজকদের পাপের ধরণ ও ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে এরা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। কখনো এদের বিষয়গুলো শিরক পর্যন্ত পৌঁছে এবং তাদেরকে দ্বীন থেকে বের করে দেয়, যদি এসব উৎসবে নির্দিষ্ট কোন কুফরি করা হয়, যেমন আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট প্রার্থনা করা, অথবা আল্লাহর রুবুবিয়াতের সিফাত দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশেষিত করা, অথবা এরূপ কোন শিরকে লিপ্ত হওয়া। আর যদি বিষয়গুলো এ পর্যায়ে না পৌঁছে, তাহলে এরা ফাসেক, কাফের নয়। আবার এদের ফাসেকির স্তর বিদআত ও ইসলামি বিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে পৃথক ও আলাদা।
আর এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির অবস্থার ভিন্নতা হিসেবে তার হুকুমও ভিন্ন হবে। যদি কুফরিতে লিপ্ত হয়, তাহলে কোন অবস্থাতেই তার সাথে বিয়ে বৈধ হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
وَلا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ
"আর মুশরিক পুরুষদের সাথে বিয়ে দিয়ো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। আর একজন মুমিন দাস একজন মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে।" [সূরা বাকারা : ২২১] এমতাবস্থায় তার সাথে বিয়ের আক্দও সম্পন্ন হবে না। এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত।
আর যদি বিদআতির বিদআত কুফরি পর্যন্ত না পৌঁছে, তবুও আলেমগণ বিদআতিদের সাথে বিবাহের সম্পর্ক কায়েম করা থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
ইমাম মালেক -রাহিমাহুল্লাহ- বলেছেন : "বিদআতিদের নিকট মেয়ে বিয়ে দেয়া যাবে না, আর না তাদের মেয়ে বিয়ে করা যাবে, তাদের উপর সালামও দেয়া যাবে।" "আল-মুদাওয়ানাহ" : (১/৮৪) অনুরূপ কথা ইমাম আহমদ ইবন হাম্বলও বলেছেন।চার ইমামগণ -রাহিমাহুমুল্লাহ- বলেছেন, বিবাহের ক্ষেত্রে দ্বীনি বিষয়ে কুফু তথা সমতা থাকা জরুরী। কোন ফাসেক পুরুষ একজন সঠিক দ্বীনদার নারীর কুফু ও সমান হতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
أَفَمَنْ كَانَ مُؤْمِناً كَمَنْ كَانَ فَاسِقاً لا يَسْتَوُونَ
"যে ব্যক্তি মুমিন সে কি ফাসিক ব্যক্তির মত ? তারা সমান নয়।" [সূরা আস-সাজদাহ : ১৮[
এতে সন্দেহ নেই যে, দ্বীনের মধ্যে বিদআত কঠিন ফিসক। দ্বীনের ব্যাপারে কুফু ও বরাবরির অর্থ : আক্দ পরিপূর্ণ হওয়ার পর যদি নারীর নিকট অথবা তার অভিভাবকের নিকট প্রকাশ পায় যে, ছেলে ফাসিক, তাহলে তারা বিয়ে ভঙ্গের দাবি জানাতে পারবে। হ্যাঁ, তারা যদি দাবি ত্যাগ করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে, তাহলে বিয়ে শুদ্ধ।
তাই এ জাতিয় বিয়ে থেকে সতর্ক থাকাই শ্রেয়, বিশেষ করে কর্তৃত্ব যেহেতু পুরুষের হাতে অনেক সময় সে স্ত্রীকে কোণঠাসা করে বিদ‘আতে লিপ্ত হতে বাধ্য করতে পারে, অথবা কতক বিষয়ে সুন্নতের খেলাফ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে পারে। আর সন্তানদের বিষয়টি আরও ভয়ানক, খুব সম্ভব সে তাদেরকে বিদ‘আতের দীক্ষার উপর অনুশীলন করাবে, ফলে আহলে সুন্নতের বিরোধী হয়ে তারা বেড়ে উঠবে। আর এতেই বিপত্তি সঠিক অনুসারীদের জন্য, যারা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের অনুসরণ করে।
মোদ্দাকথা : কোন মুসলিম পুরুষের মেয়েকে বিদ‘আতিদের নিকট বিয়ে দেয়া মাকরুহে তাহরিমী। কারণ এর ফলে অনেক ফ্যাসাদের জন্ম হয় এবং অনেক স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কোন জিনিস ত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম জিনিস দান করেন। আল্লাহ ভাল জানেন।
সমাপ্ত
মুফতী : মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2গান-বাজনা ও হারাম জিনিসের আয়োজন ব্যতীত মীলাদুন্নবী উদযাপন
প্রশ্ন :
আমরা স্পাহানবাসী, আমরা সভা সমাবেশকে একতা, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি, দ্বীনের প্রতি তাদের গর্ব ও আত্মসম্মান বৃদ্ধি এবং আমাদের প্রজন্মের চরিত্র ও আচরণের উপর প্রভাব সৃষ্টিকারী বিধর্মীদের মনগড়া উৎসব যেমন ভালবাসা দিবস ইত্যাদি থেকে সুরক্ষার উদ্দেশ্যে আমরা ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করি, এ কাজ কি বৈধ ?
উত্তর : আল-হামদুলিল্লাহ
প্রথমত :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতবিরোধ রয়েছে, তবে এ ব্যাপারে তারা একমত যে, হিজরির এগারতম বছর রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু হয়েছে ! বর্তমান যুগে এ মৃত্যু দিবসেই কিছু লোক মাহফিলের আয়োজন করে “ঈদে মীলাদুন্নবী” উদযাপন করছে।
দ্বিতীয়ত :
ইসলামি শরী‘আতে “ঈদে মীলাদুন্নবী” নামে কোন অনুষ্ঠান নেই। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ ও কোন ইমাম এ জাতীয় ঈদের সাথে পরিচিত ছিলেন না, এসব অনুষ্ঠান পালন করা তো পরের কথা। মূর্খ বাতেনী গ্রুপের কতক লোক এ ঈদের সূচনা করলে কতিপয় শহরের লোকেরা এ বিদআতের দিকে ধাবিত হয়।
তৃতীয়ত :
সুন্নতের কতক সত্যিকার ভক্ত নিজ দেশের এসব অনুষ্ঠান দেখে প্রভাবিত হয়, তারা এসব বিদ‘আত থেকে নিজেদের সুরক্ষার জন্য পরিবার নিয়ে জমায়েত হয়, বিশেষ খাবারের আয়োজন করে এবং সবাই মিলে খায়। একই উদ্দেশ্যে কেউ বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের একত্র করে, কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চরিত আলোচনা অথবা দীনি বক্তৃতা উপস্থাপনের জন্য লোকদের একত্র করে।
সন্দেহ নেই এর উদ্দেশ্য আপনাদের ভাল, যেমন পরস্পরের মাঝে ঐক্য তৈরি, অমুসলিম প্রদান ও কুফরি দেশে ইসলামি মূল্যবোধ সৃষ্টি করা ইত্যাদি।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে : আপনাদের এসব ভাল উদ্দেশ্য কোন অনুষ্ঠানকে বৈধতার সনদ দেয় না, বরং এসব ঘৃণিত বিদ‘আত। আপনাদের ঈদের প্রয়োজন হলে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহাই যথেষ্ট, আরও ঈদের প্রয়োজন হলে আমাদের সাপ্তাহিক ঈদ জুমার দিন পালন করুন, এতে আপনারা জুমার সালাত ও দ্বীনের মূল্যবোধ তৈরির জন্য একত্র হোন। এটা সম্ভব না হলে এসব বিদ‘আতী অনুষ্ঠান ব্যতীত বছরের আরও অনেক দিন রয়েছে, সেখানে বিভিন্ন বৈধ উপলক্ষে একত্র হতে পারেন, যেমন বিয়ের অনুষ্ঠান অথবা ওলিমার দাওয়াত অথবা আকিকা অথবা বিশেষ উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ইত্যাদি। এসব অনুষ্ঠানকে আপনারা পরস্পর সম্প্রতি সৃষ্টি, একতার বন্ধন তৈরি ও দ্বীনের মূল্যবোধ জাগ্রত করার ন্যায় ইত্যাদি সৎ উদ্দেশ্যে কাজে লাগাতে পারেন।
নিম্নে ভাল নিয়তে বিদআতি অনুষ্ঠানে যোগদান সম্পর্কে আলেমদের ফতোয়া উল্লেখ করছি :
এক. ইমাম আবু হাফস তাজুদ্দিন আল-ফাকেহানি -রাহিমাহুল্লাহ- মীলাদের বিভিন্ন প্রকার সম্পর্কে বলেন : “কোন ব্যক্তির নিজ অর্থায়নে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও সন্তানদের জন্য মাহফিলের আয়োজন করা, শুধু পানাহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা এবং পাপের কোন সুযোগ না রাখা, এসব অনুষ্ঠানকেই আমরা বিদআত, ঘৃণিত ও মাকরুহ বলছি, কারণ এ ধরণের অনুষ্ঠান আমাদের কোন মনীষী করেননি, যারা ছিল ইসলামের পণ্ডিত, যুগ শ্রেষ্ঠ আলেম, যুগের আলোকবর্তিকা ও জগতবাসীর উজ্জ্বল নক্ষত্র।” দেখুন : ‘আল-মাওয়ারেদ ফি আমালিল মাওলিদ’ পৃষ্ঠা : (৫)
দুই. ইবনুল হাজ আল-মালেকি -রাহিমাহুল্লাহ- গান-বাজনা ও নারী-পুরুষের সহবস্থান মুক্ত ঈদে মীলাদুন্নবী সম্পর্কে বলেন : “ঈদে মীলাদুন্নবী যদি এসব পাপাচার মুক্ত শুধু খানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে উদযাপন করা হয় এবং তাতে বন্ধু-বান্ধবদের আহ্বান করা হয় : তাহলে শুধু নিয়তের কারণে এ অনুষ্ঠান বিদআত হিসেবে গণ্য হবে, কারণ এটা দ্বীনের মধ্যে সংযোজনের শামিল, পূর্বসূরিদের আমল বিরোধী এবং তাদের নিয়ত ও কর্মের খেলাফ। আমাদের তুলনায় তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য, সম্মান ও মহব্বত বেশী ছিল। দ্বীনি বিষয়ে তারা ছিলেন আমাদের চেয়ে অগ্রগামী। তাদের কেউ মীলাদের নিয়ত করেননি। আমরা তাদের অনুসারী, অতএব তাদের জন্য যা যথেষ্ট, আমাদের জন্যও তাই যথেষ্ট। মৌলিক ও পূর্বাপর সকল বিষয়েই তারা আমাদের আদর্শ ও পথিকৃৎ। ইমাম আবু তালেব আল-মাক্কী -রাহিমাহুল্লাহ- তার কিতাবে অনুরূপই বলেছেন”। দেখুন : “আল-মাদখাল” : (২/১০)
তিনি আরও বলেন : কেউ কেউ এসব হারাম গান-বাদ্যের পরিবর্তে ‘বুখারি খতম’ দ্বারা ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করে। সন্দেহ নেই হাদিসের দরস ইবাদাত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম, এতে রয়েছে বরকত ও কল্যাণ, কিন্তু এসব হাসিল করার জন্য শরী‘আত অনুমোদিত পন্থা অবলম্বন করা জরুরী, মীলাদের উদ্দেশ্যে তা পাঠ করা নয়, যেমন সালাত আল্লাহর বিশেষ ইবাদাত, তবুও অসময়ে এ সালাত পড়া নিন্দনীয়, সালাতের এ অবস্থা হলে অন্যান্য ইবাদাতের অবস্থা কি হবে ?! দেখুন : “আল-মাদখাল” : (২/২৫)
মোদ্দাকথা : এসব মৌসুমে আপনাদের উল্লেখিত সৎ উদ্দেশ্যে যেমন পরস্পর একতা তৈরি, উপদেশ ও নসিহত প্রদান ইত্যাদি নিয়তে জমা হওয়া বৈধ নয়, বরং এসব উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য অন্য কোন উপলক্ষ বেছে নিন, পুরো বছরের যে কোন একটি দিন নির্ধারণ করুন। দোয়া করছি আল্লাহ আপনাদের কল্যাণের চেষ্টা করার তাওফিক দান করুন এবং আপনাদের হিদায়াত ও তাওফিক বৃদ্ধি করুন। আল্লাহ ভাল জানেন।
সমাপ্ত
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম-মৃত্যুর তারিখ সম্পর্কে আলেমদের বিভিন্ন বক্তব্য ও বিশুদ্ধ অভিমত
প্রশ্ন :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ কোনটি, এ বিষয়ে অনেকগুলো অভিমত আমার সংগ্রহে রয়েছে, বিশুদ্ধ অভিমত কোনটি, কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে জানতে চাই ?
উত্তর : আল-হামদুলিল্লাহ
প্রথমত : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের নির্দিষ্ট দিন ও মাস সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ বিভিন্ন মত পেশ করেছেন। এর পশ্চাতে যৌক্তিক কারণও রয়েছে, যেহেতু কারোই জানা ছিল না এ নবজাতকের ভবিষ্যৎ কেমন হবে ? তাই সবার নিকট অন্যান্য জন্মের ন্যায় তার জন্ম স্বাভাবিক ও অগুরুত্বপূর্ণ ছিল, এ জন্য কারো পক্ষেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম তারিখ নির্দিষ্ট ও চূড়ান্তভাবে জানা সম্ভব হয়নি।
ড. মুহাম্মদ তাইয়েব আন-নাজ্জার -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন :
“এর রহস্য সম্ভবত এই যে, যখন তিনি জন্ম গ্রহণ করেন, তখন তার থেকে কেউ এমন বিপদ আশঙ্কা করেনি, আর এ জন্যই জন্মলগ্ন থেকে নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত বিশ্ববাসীর দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি পরিণত হননি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের চল্লিশ বছর পর যখন আল্লাহ তাআলা তাকে রিসালাতের দাওয়াত পৌঁছানোর নির্দেশ প্রদান করেন, তখন থেকেই মানুষ এ নবী সংক্রান্ত তাদের শ্রুত ঘটনাগুলো স্মরণ করা আরম্ভ করে, সম্ভাব্য ও অপরিচিত প্রত্যেক লোকের কাছ থেকেই তার ইতিহাস জানার চেষ্টা করে, এ বিষয়ে তাদেরকে অনেকটা সমৃদ্ধ করেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খোদ নিজের বর্ণনা, বুঝ হওয়ার পর থেকে তার উপর দিয়ে যেসব ঘটনা অতিক্রান্ত হয়েছে, অথবা তিনি যেসব পরিস্থিতি পার করেছেন, অনুরূপ তার সাহাবাদের বর্ণনা এবং যারা এসব ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ছিল তাদের বর্ণনা। মুসলমানেরা তাদের নবীর ইতিহাস সংক্রান্ত শ্রুত সব ঘটনা সংগ্রহ করা আরম্ভ করেন, যেন কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য তা বর্ণনা করে যেতে পারেন”। “আল-কাওলুল মুবিন ফী সীরাতে সায়্যেদিল মুরসালীন” : (পৃষ্ঠা নং: ৭৮)
দ্বিতীয়ত : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের নির্দিষ্ট বছর ও দিন সম্পর্কে সকলে একমত :
জন্মের নির্দিষ্ট বছর : তার জন্মের নির্দিষ্ট বছর ছিল “আমুল ফিল” তথা হস্তি বাহিনীর বছর। ইমাম ইবনুল কাইয়ূম -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন : “এতে সন্দেহ নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার অভ্যন্তরে হস্তি বাহিনীর বছর জন্ম গ্রহণ করেন।” “যাদুল ‘মা‘আদ” : (১/৭৬)
মুহাম্মদ ইব্ন ইউসুফ সালেহি -রাহিমাহুল্লাহ- বলেছেন : “ইব্ন ইসহাক -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন : তার জন্ম ছিল হস্তি বাহিনীর বছর। ইব্ন কাসির -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন : জমহুরের নিকট এ অভিমতই প্রসিদ্ধ। ইমাম বুখারির উস্তাদ ইবরাহিম ইব্ন মুনযির বলেছেন : এ ব্যাপারে কোন আলেম দ্বিমত পোষণ করেননি। খলিফা ইব্ন খিয়াত, ইব্ন জাযার, ইব্ন দিহইয়াহ, ইব্ন জাওযি ও ইব্নুল কাইয়ূম এ মতের উপর সকলের ঐক্য নকল করেছেন।” “সুবুল হুদা ওয়ার রাশাদ ফি সিরাতে খাইরিল ইবাদ” : (১/৩৩৪-৩৩৫)
ড. আকরাম দিয়া আল-উমরি -ওয়াফ্ফাকাহুল্লাহ- বলেন :
“সত্য হলো : হস্তি বাহিনীর বিপরীত মতগুলোর প্রত্যেকটি সনদ দুর্বল, যার দ্বারা বুঝে আসে যে, তার জন্ম ছিল হস্তি বাহিনীর দশ বছর অথবা তেইশ বছর অথবা চল্লিশ বছর পর, তবে অধিকাংশ আলেম বলেছেন তার জন্ম হস্তি বাহিনীর বছর। আধুনিক যুগে মুসলিম ও পাশ্চাত্য গবেষকদের পরিচালিত গবেষণা এ মতই সমর্থন করে, তারা বলেছেন হস্তি বাহিনীর বছর ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ অথবা ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ছিল”। “আস-সিরাতুন নববিয়াহ আস-সাহিহাহ” : (১/৯৭)
নির্দিষ্ট দিন : সোমবার তিনি জন্ম গ্রহণ করেন, এতে কারো দ্বিমত নেই। এ দিনে তাকে নবুওয়ত প্রদান করা হয়, এ দিনেই তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
আবু কাতাদা আনসারি -রাদিআল্লাহু আনহু- থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
سئل صلى الله عليه وسلم عن صوم يوم الاثنين ؟ قال : ذاك يوم ولدت فيه ، ويوم بعثت - أو أنزل علي فيه). رواه مسلم : (1162)
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবার দিনের সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেন : এ দিনে আমি জন্ম গ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়।” মুসলিম : (১১৬২)
ইব্ন কাসির -রাহিমাহুল্লাহ- বলেছেন : “যারা বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিন রবিউল আউয়াল মাসের সতের তারিখ জন্ম গ্রহণ করেছেন, তাদের কথা সুদূর পরাহত বরং ভুল। জনৈক শি‘আ-এর লিখিত কিতাব “ইলামুর রুওয়া বি আলামিল হুদা” থেকে হাফেজ ইব্ন দিহইয়াহ উপরোক্ত মন্তব্য নকল করেন, অতঃপর তিনি এর দুর্বলতা প্রমাণ করেন, এ মতটি আসলেই দুর্বল, কারণ হাদিসের বিপরীত”। “আস-সিরাতুন নববিয়াহ” : (১/১৯৯)
তৃতীয়ত :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের ব্যাপারে মত বিরোধ হচ্ছে নির্দিষ্ট মাস ও নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে, এ বিষয়ে আমরা আলেমদের বিভিন্ন অভিমত জানতে পেরেছি, যেমন :
এক. কেউ বলেছেন: রবিউল আউয়ালের দ্বিতীয় তারিখ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন।
ইব্ন কাসির -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন : “কেউ বলেছেন রবিউল আউয়ালের দ্বিতীয় তারিখ। ইব্ন আব্দুল বারর “ইস্তেআব” গ্রন্থে এ অভিমত বলেন। ওয়াকেদি এ বর্ণনাটি আবু মাশার নাজিহ ইব্ন আব্দুর রহমান আল-মাদানি থেকেও নকল করেন”। “আস-সিরাতুন নববিয়াহ” : (১/১৯৯)
দুই. কেউ বলেছেন: রবিউল আউয়াল মাসের আট তারিখ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন।
ইব্ন কাসির -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন : “কেউ বলেছেন : রবিউল আউয়ালের আট তারিখ, এ বর্ণনাটি হুমাইদি ইব্ন হাজম থেকে বর্ণনা করেন। আর মালেক, উকাইল ও ইউনুস ইব্ন ইয়াজিদ প্রমথগণ এ বর্ণনাটি জুহরি থেকে, তিনি মুহাম্মদ ইব্ন জুবাইর ইব্ন মুতয়িম থেকে বর্ণনা করেন। ইব্ন আব্দুল বারর বলেন, ঐতিহাসিকরা এ মতটি বিশুদ্ধ বলেছেন। হাফেজ মুহাম্মদ ইব্ন মুসা আল-খাওয়ারজেমি এ তারিখের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত। হাফেজ আবুল খেতাব ইব্ন দিহইয়াহ ‘আত-তানবির ফি মাওলিদিল বাশিরিন নাজির’ গ্রন্থে এ মতটিই প্রাধান্য দিয়েছেন”। “আস-সিরাতুন নববিয়াহ” : (১/১৯৯)
তিন. কেউ বলেছেন : রবিউল আউয়ালের দশ তারিখ।
ইব্ন কাসির -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন : “কেউ বলেছেন : রবিউল আউয়ালের দশ তারিখ। এ মতটি ইব্ন দিহইয়াহ তার গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। ইব্ন আসাকের আবু জাফর আল-বাকের থেকে এবং মুজালিদ শা‘বি থেকে অনুরূপ মতই বর্ণনা করেন”। “আস-সিরাতুন নববিয়াহ” : (১/১৯৯)
চার. কেউ বলেছেন : রবিউল আউয়ালের বারো তারিখ।
ইব্ন কাসির -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন : “কেউ বলেছেন রবিউল আউয়ালের বারো তারিখ। ইব্ন ইসহাক এ মত বর্ণনা করেন। ইব্ন আবু শায়বাহ তার ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে এ মতটি আফ্ফান থেকে, সে সাঈদ ইব্ন মিনা থেকে, সে জাবের ও ইব্ন আব্বাস থেকে বর্ণনা করে, তারা উভয়ে বলেছেন : ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হস্তি বাহিনীর বছর, রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ, সোমবার দিন জন্ম গ্রহণ করেন। এ দিনেই তাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়, এ দিনেই তার মিরাজ হয়েছিল, এ দিনেই তিনি হিজরত করেছেন এবং এ দিনেই তিনি মারা যান’। জমহুর আলেমদের নিকট এ মতটিই বেশী প্রসিদ্ধ”। “আস-সিরাতুন নববিয়াহ” : (১/১৯৯)
কেউ বলেছেন : রমযান মাস, আবার কেউ বলেছেন সফর মাস ইত্যাদি মতও রয়েছে।
আমাদের কাছে স্পষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসের আট বা বারো তারিখের কোন একদিন জন্ম গ্রহণ করেন। কতক মুসলিম গণিত ও জ্যোতির্বিদ গবেষণা দ্বারা বের করেছেন যে, রবিউল আউয়াল মাসের নয় তারিখ-ই মোতাবেক সোমবার হয় ! তাহলে এটা আরেকটি মত হল। এ মতটি শক্তিশালী, এ তারিখ ৫৭১ খৃষ্টাব্দের নিসানের বিশ তারিখ মোতাবেক। বর্তমান যুগের কতক সিরাত লেখক এ মতটিই প্রাধান্য দিয়েছেন, তাদের মধ্যে উস্তাদ মুহাম্মদ আল-খিদরি ও শফিউর রহমান মোবারকপুরি অন্যতম।
আবু কাসেম আস-সুহাইলি -রাহিমাহুল্লাহ- বলেছেন : “গণিতবিদগণ বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম সৌর মাস “নিসান”-এর বিশ তারিখ মোতাবেক ছিল”। “আর-রওদুল উন্ফ” : (১/২৮২)
উস্তাদ মুহাম্মদ আল-খুদারী -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন : “মিসরের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মরহুম মাহমুদ বাশা, যিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ভূ-গোল, গণিত বিদ্যা, লিখনি ও গবেষণায় ব্যাপক পারদর্শী ছিলেন, (মৃত্যু : ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ছিল সোমবার সকাল বেলা, রবিউল আউয়াল মাসের নয় তারিখ, মোতাবেক এপ্রিল / নিসান-এর বিশ তারিখ, ৫৭১খ্রিষ্টাব্দ। এ বছরটি হস্তি বাহিনীর প্রথম বছর মোতাবেক। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন বনু হাশেম পল্লীতে আবু তালেবের ঘরে”। “নূরুল ইয়াকিন ফি সিরাতে সাইয়্যেদিল মুরসালিন”, পৃষ্ঠা : (৯) আরও দেখুন : “আর-রাহিকুল মাখতুম” : (পৃষ্ঠা নং: ৪১)
চতুর্থত :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু : এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, তিনি সোমবার দিন মারা গেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুধবার মারা গেছেন মর্মে ইব্ন কুতাইবার বর্ণনা বিশুদ্ধ নয়, তবে এর দ্বারা যদি তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাফন করা বুঝান তাহলে ঠিক আছে।
মৃত্যুর বছর : এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, তিনি এগারো হিজরিতে মারা যান।
মৃত্যুর মাস : এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, তিনি রবিউল আউয়াল মাসে মৃত্যু বরণ করেন।
কিন্তু এ মাসের নির্দিষ্ট তারিখের ব্যাপারে আলেমদের মত পার্থক্য রয়েছে :
এক. জমহুর আলেমগণ বলেছেন : রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ।
দুই. খাওয়ারেযমি বলেছেন : রবিউল আউয়ালের প্রথম তারিখ।
তিন. ইব্নুল কালবি ও আবু মিখনাফ বলেছেন : রবিউল আউয়াল মাসের দ্বিতীয় তারিখ। সুহাইলি ও হাফেজ ইব্ন হাজার এ মতের দিকেই ধাবিত হয়েছেন।
তবে জমহুর আলেমগণের মতই প্রসিদ্ধ যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগারো হিজরিতে রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ মৃত্যু বরণ করেন। দেখুন : “আর-রওদুল উন্ফ, লি সুহাইলি”: (৪/৪৩৯-৪৪০), “আস-সিরাহ আন-নববিয়াহ”, লি ইব্ন কাসির : (৪/৫০৯), “ফাতহুল বারি”, লি ইব্ন হাজার : (৮/১৩০)। আল্লাহ ভাল জানেন।
সমাপ্ত
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2* প্রশ্ন *
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
শ্রদ্ধেয় শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন (হাফেযাহুল্লাহ)
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। সাম্প্রতিক সময়ে ‘ভালবাসা দিবস’ উদযাপন অনেকের (বিশেষ করে ছাত্রীদের) মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে; যা খ্রিষ্টানদের একটি উৎসব। তখন প্রত্যেকের বস্ত্র হয় সম্পূর্ন লাল রঙের— পোশাক-জুতা সবই; আর তারা পরস্পরের নিকট লাল ফুল বিনিময় করে।
শ্রদ্ধেয় শাইখের নিকট এ-জাতীয় উৎসব উদযাপন করার বিধান বর্ণনা করার জন্য অনুরোধ রইল। তা-ছাড়া এ-রূপ বিষয়ে মুসলিমদের প্রতি আপনাদের দিকনির্দেশনা কী? আল্লাহ আপনাদের হেফাযত ও রক্ষা করুন॥
* উত্তর *
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
ওয়া ‘আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
কয়েকটি কারণে ‘ভালবাসা দিবস’ উদযাপন জায়েয নয়:—
প্রথমত : এটি একটি নব-উদ্ভাবিত বিদ‘আতী দিবস, শরীয়তে যার কোনো ভিত্তি নেই।
দ্বিতীয়ত: এটি অনৈতিক-প্রেম পরিণতির দিকে মানুষকে ধাবিত করে।
তৃতীয়ত: এর কারণে সালাফে সালেহীনের পথ-পদ্ধতির বিরোধী এরূপ অর্থহীন বাজে কাজে মানুষের মন-মগজ ব্যস্ত করার প্রবণতা তৈরি হয়।
তাই এ-দিনে দিবস উদযাপনের কোনো কিছু প্রকাশ করা কখনও বৈধ নয়; চাই তা খাদ্য-পানীয় গ্রহণ, পোশাক-আশাক পরিধান, পরস্পর উপহার বিনিময় কিংবা অন্য কিছুর মাধ্যমেই হোক না কেন।
আর প্রত্যেক মুসলিমের উচিত নিজ দীন নিয়ে গর্বিত হওয়া এবং অনুকরণপ্রিয় না হওয়া: কেউ করতে দেখলেই সেও করবে, কেউ আহ্বান করলেই তাতে সাড়া দিবে, এমনটি যেন না হয়।
আল্লাহ্র নিকট দু‘আ করি, তিনি যেন প্রত্যেক মুসলিমকে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যাবতীয় ফিতনা থেকে হেফাযত করেন; আর আমাদেরকে তিনি তাঁর অভিভাবকত্ব ও তাওফিক প্রদান করে ধন্য করেন।
লিখেছে : মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন
৫/১১/১৪২০ হি.
(১) জীবিত ব্যক্তির তিলাওয়াত বা ঈসালে সাওয়াব দ্বারা কি মৃত-ব্যক্তি উপকৃত হয় ? কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি করতেন ?
(২) তিলাওয়াতের বিনিময় গ্রহণ করা কি বৈধ ? বিনিময়দাতা কি এ জন্য গুনাহগার হবে ?
(৩) কুরআন অথবা অন্যান্য ইবাদাতের সাওয়াব কি মৃতদের নিকট পৌঁছে?
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2প্রথম ফতোয়া
প্রশ্ন :
সূরা ইখলাস পাঠ করে কেউ যদি মৃত ব্যক্তিকে ঈসালে সাওয়াব করে, তাহলে মৃত ব্যক্তি কি উপকৃত হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কি করতেন, কবরবাসীর জন্য তিনি কি তিলাওয়াত করতেন, না শুধু দোয়া করতেন?
উত্তর :
প্রথমত : কেউ যদি কুরআন তিলাওয়াত করে মৃত ব্যক্তিকে ঈসালে সাওয়াব করে, আলেমদের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী এ সাওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায় না, কারণ এটা মৃত ব্যক্তির আমল নয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
﴿وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى﴾
{আর এই যে, মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়।} {সূরা নাজম: ৩৯}
এ তিলাওয়াত জীবিত ব্যক্তির চেষ্টা বা আমল, এর সাওয়াব সে নিজেই পাবে, অন্য কাউকে সে ঈসালে সাওয়াব করার অধিকার রাখে না। এ সংক্রান্ত সৌদি আরবের “ইলমি গবেষণা ও ফতোয়ার স্থায়ী ওলামা পরিষদ” এর একটি বিস্তারিত ফতোয়া রয়েছে, নিচে তা উল্লেখ করা হলো :
প্রশ্ন :
কবর জিয়ারতের সময় সূরা ফাতেহা পাঠ করা, অথবা কুরআনের কোন অংশ পাঠ করা কি বৈধ, আর এর দ্বারা সে কি উপকৃত হবে ?
উত্তর :
বিশুদ্ধ হাদিস থেকে প্রমাণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করতেন এবং কিছু বাক্য দ্বারা তিনি কবরবাসীদের জন্য দু‘আ করতেন, যা তিনি সাহাবাদের শিখিয়েছেন, তারাও তার থেকে শিখে নিয়েছে। যেমন :
السلام عليكم اهل الديار من المؤمنين والمسلمين، وانا ان شاء الله بكم لاحقون، نسال الله لنا ولكم العافية
হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলমানগণ, তোমাদের উপর সালাম, ইনশাআল্লাহ অতিসত্বর আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো, আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য ও তোমাদের জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।” [ইবনে মাজাহ : ১৫৩৬]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করার সময় কুরআন বা তার কোন আয়াত তিলাওয়াত করেছেন এমন প্রমাণিত নয়, অথচ তিনি খুব কবর যিয়ারত করতেন। যদি তা বৈধ হত বা মৃতরা তার দ্বারা উপকৃত হত, তাহলে অবশ্যই তিনি তা করতেন এবং সাহাবাদের নির্দেশ দিতেন। বরং নবুওয়তের দায়িত্ব আদায়, উম্মতের প্রতি দয়া ও সাওয়াবের বিবেচনায় এটা তার কর্তব্য ছিল। কারণ, তার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
﴿لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَحِيمٌ﴾
{নিশ্চয় তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন, তা তার জন্য কষ্টদায়ক যা তোমাদেরকে পীড়া দেয়। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।} [সূরা তওবা: ১২৮]
অতএব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে দয়া, উম্মতের কল্যাণ কামনা ও অনুগ্রহ থাকা সত্বেও যেহেতু তিনি তা করেন নি, তাই প্রমাণ করে যে এটা না-জায়েয। সাহাবায়ে কেরাম তাই বুঝেছেন এবং এর উপরই তারা আমল করেছেন, Ñআল্লাহ তাদের সকলের উপর সন্তুষ্ট হোনÑ তারা কবর যিয়ারতের সময় মৃতদের জন্য দু‘আ করতেন ও নিজেরা নসিহত হাসিল করতেন। তারা মৃতদের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করেন নি। তাই প্রমাণিত হল যে, কবর যিয়ারতের সময় কুরআন তিলাওয়াত করা পরবর্তীতে আবিষ্কৃত বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد
“আমাদের এ দ্বীনে যে এমন কিছু আবিষ্কার করল, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যাক্ত।” [বুখারি: ২৫১২, মুসলিম: ৩২৪৮]
দ্বিতীয় ফতোয়া (প্রথম ফতোয়ার অবশিষ্টাংশ)
প্রশ্ন :
আমরা কতক মুসলিম দেশে দেখি, কুরআন তিলাওয়াতের জন্য লোক ভাড়া করা হয়, কুরআন তিলাওয়াত করে বিনিময় গ্রহণ করা কি বৈধ ? বিনিময় দাতা কি এ জন্য গোনাহগার হবে ?
উত্তর :
কুরআন তিলাওয়াত একটি খালেস ইবাদাত। মুসলিমগণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও সাওয়াবের আশায় তা সম্পাদন করবে, এসব ইবাদাতের মূল নীতিও তাই, এ জন্য কারো থেকে বিনিময় গ্রহণ বা কারো কৃতজ্ঞতা আদায় করা যাবে না। সালাফ তথা আমাদের আদর্শ মনীষীদের থেকে প্রমাণিত নয় যে, তারা মৃত ব্যক্তি, অলিমা অথবা অন্য কোন অনুষ্ঠানে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য কাউকে ভাড়া করেছেন, অথবা তারা এর নির্দেশ দিয়েছেন কিংবা এর অনুমতি প্রদান করেছেন, অথবা তারা কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে বিনিময় গ্রহণ করেছেন, বরং তারা আল্লাহর নিকট সাওয়াবের আশায় তিলাওয়াত করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন, যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে, সে যেন আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে। তিনি মানুষের নিকট প্রার্থনা থেকে সতর্ক করেছেন। সাহাবি ইমরান বিন হাসিন থেকে ইমাম তিরমিযি তার সুনান গ্রন্থে বর্ণনা করেন :
عن عمران بن حصين أنه مر على قاص يقرأ ثم سأل؛ فاسترجع ثم قال: سمعت رسول الله ـ صلى الله عليه وسلم ـ يقول: "من قرأ القرآن فليسأل الله به، فإنه سيجيء أقوام يقرؤون القرآن يسألون به الناس"
ইমরান ইবন হুস়াইন এক গল্পকারের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যে তিলাওয়াত করে করে মানুষের নিকট প্রার্থনা করত। তিনি এ দৃশ্য থেকে ইন্নালিল্লাহ পড়লেন। অতঃপর বললেন : আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শোনেছি :
“যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে, সে যেন তার ওসিলা দিয়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, কারণ অতিসত্বর এমন এক দল আভির্ভূত হবে, যারা কুরআন তিলাওয়াত করবে আর তার ওসিলা দিয়ে মানুষের নিকট প্রার্থনা করবে।” [আহমদ : ৪/৪৩২Ñ৪৩৩, ৪৩৬Ñ৪৩৭, ৪৩৯, ৪৪৫, তিরমিযি : ৫/১৭৯, হাদিস নং : (২৯১৭), ইবনে আবি শায়বাহ : ১০/৪৮০, তাবরানি : ১৮/১৬৬Ñ১৬৭, হাদিস নং : (৩৭০Ñ৩৭৪), বাগাভী : ৪/৪৪১, হাদিস নং : (১১৮৩)]
তবে যেসব অবস্থায় তিলাওয়াতকারী ব্যতীত অপরের নিকটও কুরআনের উপকারিতা পৌঁছয়, সেসব অবস্থায় বিনিময় গ্রহণ করা বৈধ, যেমন কুরআন শিক্ষা দেয়া অথবা কুরআনের মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করা ইত্যাদি। বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত, সাহাবি আবু সাইদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এক পাল বকরী গ্রহণ করেছিলেন সূরা ফাতিহা দ্বারা এক ব্যক্তিকে ঝাড়-ফূঁক করে, যাকে বিষাক্ত কীট দংশন করে ছিল। সাহাবি সাহল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মেয়েকে জনৈক ব্যক্তির নিকট এ শর্তে বিয়ে দেন যে, সে তার নিকট রক্ষিত কুরআন মেয়েকে শিক্ষা দেবে। [আহমদ : (৫/৩৩৬), বুখারি : হাদিস নং : (২৩১০), (৫০২৯), (৫০৩০), (৫০৮৭), (৫১২১), (৫১২৬), (৫১৩২), (৫১৩৫), (৫১৪১), (৫৮৭১), (৭৪১৭)] অতএব, শুধু তিলাওয়াতের বিনিময় গ্রহণ করা অথবা তিলাওয়াতের জন্য কোন দল ভাড়া করা আদর্শ মনীষীদের রীতি ও সুন্নতের খিলাফ।
দ্বিতীয়ত : উপদেশ গ্রহণ ও আখেরাত স্মরণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করতেন। তিনি নিজ পরিবারের মুসলিমদের জন্য দোয়া ও ইস্তেগফার করতেন, তাদের জন্য ‘আফিয়াত তথা নিরাপত্তা প্রার্থনা করতেন। তিনি সাহাবাদের শিক্ষা দিতেন, যেন তারা কবর যিয়ারতের সময় বলে :
السلام عليكم اهل الديار من المؤمنين والمسلمين، وانا ان شاء الله بكم لاحقون، نسال الله لنا ولكم العافية
“হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলিমগণ, তোমাদের উপর সালাম, ইনশাআল্লাহ আমরা অতিসত্বর তোমাদের সাথে মিলিত হবো, আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য ও তোমাদের জন্য নিরাপত্তার প্রার্থনা করছি।” [ইবনে মাজাহ: ১৫৩৬] আমাদের জানা মতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন তিলাওয়াত করে মৃত ব্যক্তিদের ঈসালে সাওয়াব করেন নি। অথচ তিনি অধিক কবর যিয়ারত করতেন। তিনি ছিলেন মুমিনদের উপর দয়ালু ও মেহেরবান। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
সূত্র :
اللجنة الدائمة للبحوث العلمية والافتاء
[আল-লাজনাতুদ দায়েমাহ্ লিল বুহুসিল ইলমিয়াহ ওয়াল ইফতা]
“ইলমি গবেষণা ও ফতোয়ার স্থায়ী পরিষদ”
|
সদস্য |
ভাইস-চেয়ারম্যান |
চেয়ারম্যান |
|
আব্দুল্লাহ ইবন গুদাইয়ান |
আব্দুর রাজ্জাক আফিফী |
আব্দুল আযিয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায |
তৃতীয় ফতোয়া
প্রশ্ন :
কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদাতের সাওয়াব কি মৃতদের নিকট পৌঁছয়? মৃত ব্যক্তির সন্তান বা যার পক্ষ থেকেই হোক?
উত্তর :
আমরা যতদূর জানি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন তিলাওয়াত করে নিকট আত্মীয় বা অন্য কোন মৃত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সাওয়াব করেন নি। তিলাওয়াতের সাওয়াব যদি মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছত বা এর দ্বারা সে কোনভাবে উপকৃত হত, তাহলে অবশ্যই তিনি তা করতেন, উম্মতকে বাতলে দিতেন, যেন তাদের মৃতরা উপকৃত হয়। তিনি ছিলেন মুমিনদের উপর দয়ালু ও অনুগ্রহশীল। তার পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশেদিন ও সকল সাহাবায়ে কেরাম তার যথাযথ অনুসরণ করেছেন, Ñআল্লাহ তাদের সকলের উপর সন্তুষ্ট হোনÑ আমাদের জানা মতে তারা কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে ঈসালে সাওয়াব করেন নি। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের আদর্শ অনুসরণ করাই আমাদের জন্য কল্যাণ। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
اياكم ومحدثات الامور فان كل محدثة بدعة، وكل بدعة ضلالة
“খবরদার! তোমরা নতুন আবিষ্কৃত বস্তু থেকে সতর্ক থেকো, কারণ প্রত্যেক নতুন আবিষ্কৃত বস্তু বিদ‘আত, আর প্রত্যেক বিদ‘আত গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতা।” [আবু দাউদ: ৩৯৯৩] তিনি অন্যত্র বলেন :
من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد
“যে আমাদের এ দ্বীনে এমন কিছু আবিষ্কার করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যক্ত।” [বুখারি: ২৫১২, মুসলিম: ৩২৪৮]
তাই আমরা বলি, মৃতদের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা বা করানো জায়েয নয়, এর সাওয়াব তাদের নিকট পৌঁছে না, বরং এটা বিদ‘আত। এ ছাড়া যেসব ইবাদাতের সাওয়াব মৃতদের নিকট পৌঁছে মর্মে বিশুদ্ধ দলিল রয়েছে তা অবশ্য গ্রহণীয়। যেমন মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদকা ও হজ করা মর্মে বিশুদ্ধ দলিল রয়েছে। আর যে সব বিষয়ে কোন দলিল নেই তা বৈধ নয়। তাই প্রমাণিত হল, কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতদের ঈসালে সাওয়াব করা বৈধ নয়, তাদের নিকট এর সাওয়াব পৌঁছায় না, বরং এটা বিদ‘আত। এটাই আলেমদের বিশুদ্ধ অভিমত। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
সূত্র :
اللجنة الدائمة للبحوث العلمية والافتاء
[আল-লাজনাতুদ দায়েমাহ্ লিল বুহুসিল ইলমিয়াহ ওয়াল ইফতা]
“ইলমি গবেষণা ও ফতোয়ার স্থায়ী পরিষদ”
|
সদস্য |
ভাইস-চেয়ারম্যান |
চেয়ারম্যান |
|
আব্দুল্লাহ ইবন গুদাইয়ান |
আব্দুর রাজ্জাক আফিফী |
আব্দুল আযিয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায |
সমাপ্ত
: عربي
বিষয়ের সংযুক্তিসমূহ : 2শীত মৌসুম পর্যন্ত রমজানের কাজা বিলম্ব করার ইচ্ছা, কারণ তখন দ্বীন ছোট হয়।
প্রশ্নঃ শীত কালে রমজানের কাজার বিধান কি, যখন দ্বীন ছোট থাকে?
উত্তরঃ
আল-হামদুলিল্লাহ
রমজানে যে বেক্তি ইফতার করে, আগামী রমজানের পূর্বেই তার কাজা ওয়াজিব। শীত বা যে কোন মৌসুমে তা হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ
“তবে তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ হবে, কিংবা সফরে থাকবে, তাহলে অন্যান্য দিনে সংখ্যা পূরণ করে নেবে।Ó সূরা বাকারাঃ (১৮৪)
আয়েশা(রাহঃ) থেকে প্রমাণিত, তার উপর কাজা থাকত, কিন্তু রাসুলুল্লাহ(সাঃ)এর উপস্থিতির কারনে শাবান ভিন্ন অন্য সময়ে তিনি তা কাজা করতেন না।
আল্লাহ ভালো জানেন।
সূত্রঃ
ফতোয়া লাজনায়ে দায়েমা
শায়খ আব্দুল আযীয বিন বায
শায়খ আব্দুর রায্যাক আফীফী
শায়খ আব্দুল্লাহ বিন গাদিইয়ান
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment